রবিবার , ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি

সানলাইফে জমেছে বকেয়া, গ্রাহকের টাকা কোথায় গেল?

Writer
বাংলা পত্রিকা ডেস্ক
20 Sep, 2026 11:14 AM 4 বার পঠিত 1 মিনিট পড়ার সময়

ছবি: সংগৃহীত

  • গ্রাহকের ৩০ কোটি টাকার বিমা দাবি অপরিশোধিত, যার ৯২ শতাংশই মেয়াদপূর্তির।

  • এক বছরে নবায়ন প্রিমিয়াম আয় কমেছে প্রায় ৬১ শতাংশ।

  • ব্যাংক ওভারড্রাফট ১০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, লাইফ ফান্ড নেমেছে ৫০ কোটির নিচে।

সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির দীর্ঘদিনের বকেয়া প্রিমিয়াম আদায়ে কোনো অগ্রগতি নেই। ২০২৫ সাল শেষে কোম্পানিটির বকেয়া প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ৩৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) এই বকেয়া থেকে এক টাকাও আদায় করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। একই সময়ে নতুন ও নবায়ন প্রিমিয়াম আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমার পাশাপাশি গ্রাহকদের ৩০ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি বিমা দাবি অপরিশোধিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯২ শতাংশই মেয়াদপূর্তির দাবি।

সানলাইফের ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত ও ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণে এসব উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে।

গ্রাহকদের পাওনা আটকে চরম অসন্তোষ

আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, জুন শেষে সানলাইফের অপরিশোধিত বিমা দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা (৯২ শতাংশ) মেয়াদপূর্তির পাওনা। অথচ ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটি যেখানে ১৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার দাবি পরিশোধ করেছিল, চলতি বছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দাবি পরিশোধ কমেছে ৭৩ শতাংশ।

পাওনা না পেয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর সানলাইফের শতাধিক গ্রাহক ও মাঠকর্মী বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন। তাঁরা বাউন্স হওয়া চেকের নিষ্পত্তি ও দ্রুত বকেয়া পরিশোধের দাবিতে সংস্থাটির চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন।

অস্তিত্বহীন বকেয়া ও রাইট-অফ প্রক্রিয়া

২০২৫ সাল শেষে সানলাইফের বকেয়া প্রিমিয়াম ছিল ৩৯ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা থেকে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আদায় হয়েছে শূন্য টাকা। এর আগে ২০২৫ সালেও আদায় হয়েছিল মাত্র ৫ লাখ টাকা।

কোম্পানির নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পুরোনো বকেয়া প্রিমিয়াম ও অগ্রিমের একটি অংশের বৈধ সহায়ক নথি, ভাউচার ও বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে বর্তমান ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘রাইট-অফ অ্যান্ড রাইট-ব্যাক পলিসি’ অনুমোদন করা হয়। ২০২৬ অর্থবছর থেকে এসব হিসাব রাইট-অফ বা হিসাবের খাতায় অবলেখন করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

ব্যবসায়ে ধস, বাড়ছে ব্যাংক ঋণ

কোম্পানিটির ব্যবসায়িক আয়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে নবায়ন প্রিমিয়াম আয় ছিল ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা চলতি বছরের একই সময়ে ৬০.৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকায়। প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম আয়ও ৬৫.৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৯৪ লাখ টাকায়। সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

বিপরীতে প্রিমিয়াম আয়ের বিপুল অংশ চলে যাচ্ছে ব্যবস্থাপনায়। ৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আয়ের বিপরীতে কমিশন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, যা মোট আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ।

আয় কমলেও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যাংক ঋণ ও সুদের বোঝা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে (এমটিবি) কোম্পানিটির ওভারড্রাফট (ব্যাংক জমাতিরিক্ত ঋণ) বেড়ে চলতি বছরের জুন শেষে ১০ কোটি ৩ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে যেখানে এই ঋণের বিপরীতে সুদ ব্যয় ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪ লাখ টাকায়।

লাইফ ফান্ডে টান, শেয়ার বেচে পালাচ্ছেন পরিচালকরা

কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার প্রধান সূচক 'লাইফ ফান্ড'-এও টান পড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে লাইফ ফান্ড ছিল ৫৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা ছয় মাস পর কমে ৪৯ কোটি ৬২ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।

এদিকে নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে সানলাইফের হিসাবরক্ষণ নিয়ে বেশ কিছু অনিয়ম উঠে এসেছে। ১২ কোটি ১৩ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদের পূর্ণাঙ্গ রেজিস্টার না থাকা, নিয়ম অনুযায়ী আয়করের সংস্থান না করা এবং ১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার পুঁজিবাজার বিনিয়োগের সঠিক মূল্যায়ন না করার বিষয়গুলো এতে স্পষ্ট হয়। এছাড়া বিডি থাই ফুডকে দেওয়া ৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকার অগ্রিমের পক্ষেও বৈধ কোনো ভাউচার মেলেনি।

প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক সংকটের মধ্যে শেয়ার বিক্রি করে সরে দাঁড়িয়েছেন অন্যতম উদ্যোক্তা। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সানলাইফের উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ারধারণ ৩৫.৬৬ শতাংশ থেকে কমে ৩১.৫৫ শতাংশে নেমেছে। এ সময়ে গ্রিন ডেল্টা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘জিডি অ্যাসিস্ট লিমিটেড’ তাদের পুরো ৬ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানি থেকে বেরিয়ে গেছে।

ট্যাগ: অর্থনীতি