দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে আরও ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানানোর পর উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। তবে ঘোষণার পরপরই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে সামনে এসেছে বড় কিছু প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় সংশয় হলো - বিশাল এই কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার জোগান বড়পুকুরিয়া খনি দীর্ঘমেয়াদে দিতে পারবে কি না। পাশাপাশি উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহে জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সংবিধানের ৬৮ বিধির আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ নতুন এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা জানান। একই সঙ্গে তিনি বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সংস্কারকাজ চলার কথাও উল্লেখ করেন। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পর্যাপ্ত জ্বালানি ও সঞ্চালন অবকাঠামো নিশ্চিত না করে এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিলে তা শেষ পর্যন্ত শুধু ঘোষণাতেই আটকে থাকতে পারে।
৫২৫ মেগাওয়াটই ধুঁকছে, ৬০০ চলবে কীভাবে?
বর্তমানে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি এবং ২৭৫ মেগাওয়াটের একটিসহ মোট তিনটি ইউনিট রয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাবে, এর মোট স্থাপিত ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট। কিন্তু স্থাপিত সক্ষমতা আর বাস্তব উৎপাদনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যান্ত্রিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও কয়লা সরবরাহে ঘাটতির কারণে বিভিন্ন সময় কেন্দ্রটির একাধিক ইউনিট বন্ধ থেকেছে। চলতি বছরও ইউনিট-১ ও ইউনিট-৩ বেশ ভোগান্তির পর পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছে। বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেখানে বর্তমান ৫২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে অতিরিক্ত ৬০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জ্বালানি নিশ্চয়তা দেওয়া সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হবে।
কয়লার জোগান নিয়ে মূল শঙ্কা
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি খনির কয়লার ওপর নির্ভরশীল। খনি কর্তৃপক্ষ বিসিএমসিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসের হিসাবে খনি থেকে দিনে গড়ে ৩ হাজার ১০০ টনের মতো কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট সাড়ে ৪৫ লাখ (৪.৫০ মিলিয়ন) টন কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, খনির বর্তমান এই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে নতুন ৬০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের বিশাল চাহিদার সমন্বয় কীভাবে হবে? বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা উত্তোলন ব্যবস্থা অনেকটাই ফেজ (স্তর) পরিবর্তন ও যন্ত্রপাতি স্থানান্তরের ওপর নির্ভরশীল। অতীতে এক ফেজ থেকে নতুন ফেজে যাওয়ার সময় কয়লা উত্তোলন সাময়িক বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন ১৪০৬ নম্বর ফেজে উৎপাদন শুরুর পর দৈনিক উত্তোলন সক্ষমতা ৩ হাজার ৫০০ টনে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু বিদ্যমান কেন্দ্র ও নতুন কেন্দ্র উভয়ের চাহিদা মেটাতে এই উত্তোলন কতটা যথেষ্ট হবে, তা এখনো অস্পষ্ট।
গ্রিড সক্ষমতায় ঘাটতি
বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই তা গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় না, এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সঞ্চালন লাইন বা গ্রিড। নতুন ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো প্রস্তুত নয়। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন, গ্রিড লাইনের প্রয়োজন হলে সরকার নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে তা নির্মাণের উদ্যোগ নিতে পারে। এর অর্থ হলো, সঞ্চালন অবকাঠামোর কাজটিও শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।
অমীমাংসিত অনেক প্রশ্ন
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন এই মেগা প্রকল্প নিয়ে এখনো অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর অজানা।
১. প্রকল্পটির সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় কত হবে?
২. ঠিক কোন স্থানে কেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে?
৩. বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) বা কারিগরি নকশা চূড়ান্ত হয়েছে কি না?
৪. অর্থায়ন কি সরকারি অর্থে হবে, নাকি দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে?
৫. দরপত্র আহ্বানের সময়সূচি কী?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটিকে ‘নির্মাণাধীন’ না বলে ‘পরিকল্পনাধীন’ হিসেবে ধরাই বাস্তবসম্মত।
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে সরে এসে দেশীয় কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর যে নীতি সরকার নিয়েছে, তার সঙ্গে বড়পুকুরিয়ার নতুন কেন্দ্রটি বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকল্পটি সফল হলে উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে অভাবনীয় পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটির সফলতা নির্ভর করছে চারটি বিষয়ের নিখুঁত সমন্বয়ের ওপর নিরবচ্ছিন্ন কয়লা উত্তোলন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং শক্তিশালী জাতীয় গ্রিড। এই সমন্বয় করা না গেলে ৬০০ মেগাওয়াটের এই ঘোষণা দীর্ঘমেয়াদি ঝুলে থাকা প্রকল্পের তালিকাই শুধু দীর্ঘ করবে।