শুক্রবার , ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি

ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের নজিরবিহীন নিয়োগ জালিয়াতি

Writer
বাংলা পত্রিকা ডেস্ক
23 Sep, 2026 11:03 AM 7 বার পঠিত 1 মিনিট পড়ার সময়

ছবি: সংগৃহীত

এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময়ে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটিতে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মী নিয়োগ পান। তাদের মধ্যে ৪৬৬ জনকে লেটারাল এন্ট্রি এবং ১০ হাজার ৩৩৬ জনকে সরাসরি প্রবেশের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পরিদর্শনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি ইতিপূর্বে গভর্নরের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানায় পরিবর্তনের পর থেকে কর্মী নিয়োগে ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। নীতিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রাক-আবেদনের জন্য অন্তত ১৫ দিন সময় দেওয়ার বিধান ছিল। এরপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ চূড়ান্ত করার কথা। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রার্থীকে পৃথকভাবে অন্তত ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হতো। কিন্তু ৮ হাজার ৫৪২ জনের ক্ষেত্রে এসব কোনো নিয়মের তোয়াক্কাই করা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অবৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে ওই সময় ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালার ৭.০৪ ধারায় একটি নতুন নিয়ম যুক্ত করা হয়। এতে জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংকের এমডি ও সিইওকে এন্ট্রি লেভেল ও লেটারাল এন্ট্রি গ্রেডে কর্মী নিয়োগ এবং কিছু আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করার একক ক্ষমতা দেওয়া হয়।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, সাধারণত জরুরি পরিস্থিতিতে এক-দুটি লেটারাল এন্ট্রি বা কারিগরি পদে নিয়োগে এ ধরনের ধারা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে এই ধারার সুযোগ নিয়ে এন্ট্রি লেভেলের পদেই ৬ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। শুধু তা-ই নয়, সে সময় ব্যাংকে বড় কোনো জনবল সংকট না থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কর্মী নেওয়া হয়েছে।

নিয়োগে চট্টগ্রামের একচ্ছত্র আধিপত্য

এস আলমের নিয়ন্ত্রণকালে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৮ হাজার ৯৯ জনই ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের। তাঁদের মধ্যে আবার ৫ হাজার ১৪৮ জন এস আলমের নিজ এলাকা পটিয়ার বাসিন্দা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি না থাকার সুযোগে চট্টগ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী নেওয়া হয়েছে। একক এলাকা থেকে এভাবে নিয়োগের ফলে ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং অন্যান্য অঞ্চলের মেধা বঞ্চিত হয়েছে।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানায়, কোনো পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি নিয়োগ দিতে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে সিভি সংগ্রহের জন্য বিশেষ বক্স রাখা হতো। সেখানে 'পটিয়া জেনারেল', 'পটিয়া ক্যাশ', 'পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া', 'পুরুষ ক্যাশ-গন্ডামারা-বাঁশখালী', 'মহিলা-ক্যাশ' ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে বক্স করা থাকত। পরবর্তীতে তালিকা ধরে প্রার্থীরা ব্যাংক থেকে সরাসরি নিয়োগপত্র পেতেন।

এমনকি ব্যাংকের একটি ব্যাচে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করার পরেও ফেল করা প্রার্থীদের ডেকে এনে নিয়োগ দেওয়ার তথ্য মিলেছে। এছাড়া লিখিত পরীক্ষা না দিয়েও ১২ জন সরাসরি মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পান।

একইভাবে ডিএমডি পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২০ বছরের অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এস আলমের ব্যক্তিগত সহকারী মাত্র ৮ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ডিএমডি পদ হাতিয়ে নেন।

পরীক্ষা বয়কট ও ৪,৬৮৫ জনের চাকরিচ্যুতি

অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বৈধতা ও দক্ষতা যাচাইয়ে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে বিশেষ পরীক্ষা নেয় ব্যাংকটি। মোট ৫ হাজার ৩৭৩ কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং উত্তীর্ণ হন।

অন্যদিকে বাকি ৪ হাজার ৯৭২ জন কর্মী পরীক্ষা বর্জন করে কর্মবিরতি, সড়কে বিক্ষোভ ও সংবাদ সম্মেলন করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহীদের শারীরিকভাবে হেনস্তাও করেন।

শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ৪ হাজার ৬৮৫ জন কর্মীকে তিন মাসের বেতন দিয়ে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসাইন বলেন, `তাদের অবৈধতার কারণে নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস রুল অনুসরণ না করায় দক্ষতা পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তারা পরীক্ষা বর্জন ও প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করায় নিয়ম অনুযায়ী চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।'

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।

ট্যাগ: অর্থনীতি