শুক্রবার , ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ধর্ম

মুসলিম পরিবার গঠনে নারীর ভূমিকা

Writer
মাওলানা হাফিজা আক্তার
24 Sep, 2026 05:10 PM 14 বার পঠিত 1 মিনিট পড়ার সময়

ছবি: সংগৃহীত

একটি জাতির চরিত্র, মূল্যবোধ ও সভ্যতার বীজ রোপিত হয় পরিবারের ভেতরে। আর সেই পরিবারের প্রাণকেন্দ্র হলেন নারী—মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোনের বহুমাত্রিক পরিচয়ে তিনি একটি পরিবারের আত্মিক শক্তি, নৈতিক শিক্ষাগুরু এবং প্রজন্ম নির্মাণের কারিগর। ইসলাম নারীকে কখনো অবমূল্যায়ন করেনি বরং সম্মান, অধিকার ও দায়িত্বের সমন্বয়ে তাকে পরিবার ও সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এ কারণেই পবিত্র কোরআনে নারীদের অধিকার, মর্যাদা ও পারিবারিক বিধান নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল হয়েছে—সুরা আন-নিসা।

পরিবার আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন
আল্লাহ তাআলা দাম্পত্য জীবনকে তাঁর অসীম কুদরতের একটি মহান নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন  “আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।”
(সুরা আর-রূম: ২১)
এই আয়াত দাম্পত্য জীবনের তিনটি ভিত্তি স্পষ্ট করে—প্রশান্তি (সাকিনা), ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) এবং দয়া (রাহমাহ)। ইসলামী পরিবার কেবল বসবাসের একটি কাঠামো নয় এটি আত্মিক নিরাপত্তা ও মানসিক আশ্রয়ের প্রতিষ্ঠান।

স্ত্রী প্রশান্তির আশ্রয়
কোরআনে আল্লাহ বলেন “তিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়।”
(সুরা আল-আরাফ: ১৮৯)
এখানে স্ত্রীকে এমন একজন সঙ্গী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার উপস্থিতি ঘরে স্বস্তি ও স্থিরতা এনে দেয়। তাই একজন মুমিন নারীর অন্যতম গুণ হলো—পরিবারে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করা।
সদ্ভাবে জীবনযাপনের নির্দেশ
সংসারে মতভেদ, মান-অভিমান বা স্বভাবের অমিল থাকতেই পারে। ইসলাম এসব ক্ষেত্রে সহনশীলতা ও সৌজন্যের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। যদি তাদের কোনো বিষয় তোমাদের অপছন্দ হয়, তবে এমনও হতে পারে যে আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রেখেছেন।”
(সুরা আন-নিসা: ১৯)
এ আয়াত শুধু স্বামীর প্রতি নির্দেশ নয়; এটি পারিবারিক সম্পর্কের একটি নৈতিক নীতি—অন্যের ত্রুটির আগে তার গুণ দেখার শিক্ষা।

উত্তম স্ত্রীর পরিচয়
রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “সবচেয়ে উত্তম নারী কে?” তিনি বলেন “যার দিকে স্বামী তাকালে সে তাকে আনন্দ দেয়, বৈধ বিষয়ে নির্দেশ দিলে তা পালন করে এবং নিজের সততা ও স্বামীর সম্পদের ব্যাপারে এমন কিছু করে না যা স্বামী অপছন্দ করে।”
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩২৩১)
এ হাদিসে বিশ্বস্ততা, সৌন্দর্যময় আচরণ এবং পারিবারিক দায়িত্বশীলতাকে উত্তম স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সন্তান গঠনের প্রথম শিক্ষিকা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে… নারী তার স্বামীর ঘর ও সন্তানদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।”
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
মায়ের কোলই সন্তানের প্রথম বিদ্যালয়। একজন আদর্শ মা কেবল সন্তানকে লালন করেন না; তার ঈমান, চরিত্র ও মানবিকতা গড়ে তোলেন।
হালাল জীবিকার অনুপ্রেরণায় নারীর ভূমিকা
পরিবারে অতিরিক্ত ভোগবিলাসের চাপ অনেক সময় মানুষকে হারাম উপার্জনের দিকে ঠেলে দেয়। তাই একজন নেককার স্ত্রীর অন্যতম দায়িত্ব হলো হালাল আয়ে সন্তুষ্ট থাকা এবং স্বামীকে সৎ পথে উৎসাহিত করা।
কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে—
“হে মুমিনগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। সুতরাং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। আর যদি ক্ষমা করো, উপেক্ষা করো ও মার্জনা করো, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
(সুরা আত-তাগাবুন: ১৪)

এখানে “শত্রু” বলতে ব্যক্তি নয়; এমন মোহ বা প্ররোচনা বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে।

আদর্শ পরিবারের ভিত্তি তাকওয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “দুনিয়া ভোগের বস্তু, আর দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ হলো নেককার স্ত্রী।”
(সহিহ মুসলিম: ১৪৬৭)
অন্যদিকে কোরআন বলে—
“হে মানুষ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো…”
(সুরা আত-তাহরিম: ৬)
অতএব, পরিবারকে ঈমান, ইবাদত, নৈতিকতা ও ভালোবাসার পরিবেশে গড়ে তোলা নারী-পুরুষ উভয়ের যৌথ দায়িত্ব।
একটি সুস্থ পরিবারই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। নারী যখন স্নেহ, প্রজ্ঞা, ধৈর্য, তাকওয়া ও নৈতিক দৃঢ়তার মাধ্যমে পরিবারকে আলোকিত করেন, তখন সেই আলো সন্তান, সমাজ এবং রাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ নারী কেবল ঘরের সৌন্দর্য নন; তিনি একটি সভ্য, নৈতিক ও আল্লাহভীরু প্রজন্ম নির্মাণের প্রধান কারিগর।
প্রশান্তির ঘর থেকেই শুরু হয় একটি কল্যাণময় সমাজের যাত্রা।

ট্যাগ: ধর্ম