ইসলামের ইতিহাসে মহান মনীষী ও বুজুর্গানে দ্বীনের অম্লান স্মৃতি ও আধ্যাত্মিক চর্চা যুগ যুগ ধরে মানবজাতিকে সত্য ও সরল পথের দিশা দেখিয়ে আসছে। তেমনই এক অনন্য পুরুষ, কাদেরিয়া সুফি ধারায় পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব, মহান আলেম ও 'বড়পীর' নামে সুপরিচিত হজরত শেখ আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)। প্রতি বছর হিজরি রবিউস সানি (বা রবিউল আখির) মাসের ১১ তারিখ বিশ্বজুড়ে সুফি অনুসারী ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়।
‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’-এর নামকরণ ও ইতিহাস
‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ শব্দ দুটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। ‘ফাতিহা’ শব্দের অর্থ দোয়া, মোনাজাত, জিয়ারত কিংবা কোনো বুজুর্গের রুহের মাগফিরাত ও মর্যাদা কামনায় কুরআন তিলাওয়াত করে ইসালে সওয়াব করা। আর ফারসি ‘ইয়াজদাহম’ শব্দের অর্থ ‘এগারো’। সুতরাং ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলতে রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখের ফাতিহা শরিফ বা স্মরণ অনুষ্ঠানকে বোঝায়।
হিজরি ৫৬১ সালের ১১ রবিউস সানি প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক ও আধ্যাত্মিক সাধক হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) মৃত্যুবরণ করেন। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত ও মর্যাদা কামনায় আয়োজিত ইসালে সওয়াব ও মোনাজাতের মাহফিলই ইতিহাসে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ৪৭০ হিজরিতে (১০৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) ১ রমজান ইরানের জিলান প্রদেশের কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আবু সালেহ মুসা এবং মায়ের নাম সাইয়েদা উম্মুল খায়ের ফাতেমা। পিতৃসূত্রে তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জ্যেষ্ঠ দৌহিত্র হজরত হাসান (রা.) এবং মাতৃসূত্রে কনিষ্ঠ দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.)-এর বংশধর ছিলেন।
বাল্যকালেই উচ্চতর দ্বীনি জ্ঞানার্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু বাগদাদে গমন করেন। সেখানে শায়খ আবু জাকারিয়া তাবরিজি (রহ.)-সহ সময়ের সেরা আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও আরবি সাহিত্যে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি সুন্নি মতাদর্শের অনুসারী এবং হাম্বলি ও শাফেয়ি মাজহাবের শীর্ষস্থানীয় ফকিহ ছিলেন।
সুফিদর্শন ও ইসলাম প্রসারে অবদান
বাগদাদে আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর বয়ান ও আধ্যাত্মিক নসিহত শোনার জন্য হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগম হতো। তাঁর সুগভীর জ্ঞান, হৃদয়স্পর্শী প্রজ্ঞা ও মোহাচ্ছন্ন কণ্ঠের দরসে মুগ্ধ হয়ে অজস্র অমুসলিম স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অসংখ্য পথভ্রষ্ট মানুষ হেদায়েতের আলো খুঁজে পান। ইতিহাসপ্রসিদ্ধ শাসক সুলতান নুরুদ্দিন জেনকি ও ক্রুসেডজয়ী বীর গাজী সালাহউদ্দিন আইয়ুবির অনেক উপদেষ্টা ও সেনাপতি সরাসরি তাঁর দরসের ছাত্র ছিলেন।
সুফি ধারায় পরম আধ্যাত্মিক উচ্চ মর্যাদার কারণে তাঁকে ‘গাউসুল আজম’ বা ‘বড়পীর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি একাধারে তত্ত্বীয় সুফিসাধক, ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন ও কাব্যের অগাধ পণ্ডিত ছিলেন। হাদিস ও ইসলামি সাহিত্যে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর রচিত কালজয়ী গ্রন্থগুলোর মধ্যে— ‘গুনিয়াতুত তালিবিন’, ‘ফাতহুল গাইব’, ‘আল-ফাতহুর রাব্বানি’ ও ‘কাসিদায়ে গাউসিয়া’ আজও ইসলামি আলেম সমাজ ও জ্ঞানপিপাসুদের কাছে অমূল্য সম্পদ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত প্রিয় বান্দাদের মর্যাদা সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন—
‘জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর অলি বা বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেন না।’ (সুরা ইউনুস: আয়াত ৬২)
ওফাত ও দিবসটির শরয়ি বিধান
হিজরি ৫৬১ সনের ১১ রবিউস সানি (১১৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি) এই মহান আধ্যাত্মিক সাধক ৮৯ বছর বয়সে বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। সেখানেই তাঁর মাজার শরিফ অবস্থিত।
এ দিনে মুসলিম সমাজ মূলত তাঁর পবিত্র জীবন, নিষ্কলঙ্ক চরিত্র ও দ্বীনের খেদমত নিয়ে আলোচনা করে। দরুদ পাঠ, দান-সদকা ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে তাঁর রুহের মাগফিরাত ও মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ইসালে সওয়াব করা হয়। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
‘মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার তিনটি আমল ব্যতীত বাকি সব আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়— ১. সদকায়ে জারিয়া, ২. এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়, এবং ৩. এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম: ৪২০৫)
তবে ওলামায়ে কেরামের মতে, এ দিনকে কেন্দ্র করে অতি-আনুষ্ঠানিকতা, অহেতুক আলোকসজ্জা বা খামখেয়ালি কোনো কর্মকাণ্ডের ইসলামে অনুমোদন নেই। কেবল বাহ্যিক আড়ম্বর নয়; বরং তাঁর সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষাকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করাই এই দিনের মূল উদ্দেশ্য।
প্রকৃত বার্তা ও শিক্ষা
বড়পীর হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) ছিলেন সততা, আমানতদারিতা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের এক অনন্য বাতিঘর। ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ পালনের আসল বার্তাটি কেবল বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে মিলাদ বা দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং তাঁর মতো চারিত্রিক মাধুর্য গড়ে তোলা, সদা সত্য কথা বলা এবং মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহর প্রতি একনিষ্ঠ থেকে জীবন পরিচালনা করার মাঝেই নিহিত রয়েছে এই দিবসের প্রকৃত শিক্ষা।