অস্ত্রোপচারের টেবিলে যে স্কাল্পেলটি একজন মুমূর্ষু রোগীকে নতুন জীবন দেয়, সামান্য অসতর্কতায় বা অসৎ উদ্দেশ্যে সেটিই আবার কেড়ে নিতে পারে কোনো নিরপরাধ প্রাণ। যন্ত্র বা টুলের নিজস্ব কোনো চরিত্র নেই; তার ব্যবহারকারীর নিয়তের ওপরই নির্ভর করে তার ভালো-মন্দ প্রভাব। মানুষের মেধা বা বুদ্ধিমত্তার বিষয়টিও ঠিক এ রকম একটি দ্বিধারী তলোয়ার। উচ্চ মেধা শেষ পর্যন্ত সমাজকে আলোর পথ দেখাবে নাকি অন্ধকারের অতলে নিমজ্জিত করবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যক্তির নৈতিক ভিত্তি, সামাজিক দীক্ষা এবং কাঠামোগত জবাবদিহির ওপর।
আমাদের সমাজে জিপিএ-৫ পাওয়া, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী কিংবা যেকোনো খাতের সেরাদের আমরা অবলীলায় ‘ভালো মানুষ’ বলে ধরে নিই। মেধা ও নৈতিকতাকে এক করে দেখার এই সামাজিক প্রবণতা শুধু এক ধরনের অন্ধ মোহ নয়, বরং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজ পরিচালনার ভিত্তিকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করায়। প্রশ্ন জাগে, মেধাবী হওয়া মানেই কি সৎ হওয়া? নাকি বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিকতা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ ধরে হাঁটে?
মনোবিজ্ঞান ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার আধুনিক নির্যাস অত্যন্ত স্পষ্ট: মেধা এবং নৈতিকতা মানুষের মনের দুটি ভিন্ন কামরা। একটির উপস্থিতি অন্যটির স্বয়ংক্রিয় নিশ্চয়তা দেয় না।
বিবর্তনবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রকৃতির আদি নিয়মটি ‘ভালো মানুষ’ তৈরির জন্য নয়, বরং ‘টিকে থাকা ও বংশ বিস্তারের’ জন্য তৈরি। চার্লস ডারউইনের ‘যোগ্যতমের জয়’ (Survival of the Fittest) ধারণায় বুদ্ধিমত্তা বিকশিত হয়েছে এক ধরনের অস্ত্র হিসেবে। শিকার ধরা, বৈরী পরিবেশে কৌশল খাটিয়ে বেঁচে থাকা, দলের মধ্যে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতের বিপদ আঁচ করা এসবের প্রয়োজনেই আমাদের মস্তিষ্কের আকার বড় হয়েছে।
প্রকৃতির এই রুঢ় নিয়মে বুদ্ধিমত্তা মূলত অভিযোজনের হাতিয়ার, নৈতিকতার সার্টিফিকেট নয়। পশুরাজ্যে বা মানবসমাজেও এক ধরণের চাতুর্য বা প্রতারণা টিকে থাকার অন্যতম কৌশল। ছদ্মবেশ ধারণকারী অক্টোপাস থেকে শুরু করে সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়া চতুর মানুষ সবার ক্ষেত্রেই বুদ্ধিমত্তার কাজ হলো নিখুঁত রণকৌশল সাজানো। সেই রণকৌশল সমাজকে গড়তেও পারে, আবার ভেঙে চুরমারও করে দিতে পারে।
রাজনীতি ও ক্ষমতার মনস্তত্ত্বে ‘মাকিয়াভেলিয়ান বুদ্ধিমত্তা’ একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্ক কেবল একে অপরকে সাহায্য করার জন্য বিকশিত হয়নি; বরং কে কাকে ফাঁকি দিচ্ছে, কার সাথে আঁতাত করলে ক্ষমতার শীর্ষে যাওয়া যাবে, কিংবা কাকে সরিয়ে নিজের জায়গা পাকা করা যাবে এই জটিল দাবার চাল মেলাতেই বুদ্ধির বড় অংশ ব্যবহৃত হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের মানসিক সক্ষমতাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে দেখেন। আইকিউ (বুদ্ধ্যঙ্ক) ভালো হওয়ার অর্থ এই নয় যে ব্যক্তির ইকিউ (আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা) কিংবা সহানুভূতির স্তরও উঁচুতে থাকবে। একজন মানুষের আইকিউ আকাশচুম্বী হতে পারে, কিন্তু তার হৃদয়ে সহানুভূতির লেশমাত্র নাও থাকতে পারে। অন্যদিকে, কোনো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের আইকিউ গড়পড়তা হলেও তার মানবিক মূল্যবোধ ও সততা হতে পারে অনন্য।
নৈতিক বিকাশের স্তর নিয়ে কাজ করা গবেষক লরেন্স কোলবার্গ দেখিয়েছেন, সমাজ বা নৈতিকতার নিয়মগুলো তাত্ত্বিকভাবে বোঝা এবং বাস্তব জীবনে তা মেনে চলা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ফলে, বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা অনেক সময় নৈতিকতার চমৎকার ব্যাখ্যা দিতে পারলেও নিজেদের স্বার্থের ক্ষেত্রে সেই নিয়মের তোয়াক্কা করেন না।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষকে কেবল তার অভ্যন্তরীণ আদর্শ দিয়ে বিচার করা কঠিন। কোনো একটি অসৎ বা দুর্নীতিগ্রস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে যদি একজন অতি মেধাবী মানুষ যুক্ত হন, তবে তার মেধা সেই দুর্নীতিকে আরও সুচারু ও সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানেরও একটি প্রাচীন পর্যবেক্ষণ হলো ক্ষমতা ও সুযোগ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। মেধা তখন ক্ষমতার অপব্যবহারকে যৌক্তিক রূপ দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এর হাজারো প্রমাণ মেলে। এক প্রান্তে যদি আলবার্ট আইনস্টাইন বা মেরি কুরির মতো মেধাবীরা বিজ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করে থাকেন, তবে অন্য প্রান্তে জোসেফ গোয়েবলস বা রেইনহার্ড হেইড্রিখের মতো প্রখর ধীশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা মানব ইতিহাসের নৃশংসতম অপরাধের নীলনকশা তৈরি করেছিলেন। প্রখর মেধা তাদের হৃদয়হীন দানব হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
মেধাবীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো তাদের ‘অন্যায় যৌক্তিকীকরণের’ (Moral Rationalization) ক্ষমতা। একজন সাধারণ মানুষ কোনো অপরাধ করলে তার অপরাধবোধ কাজ করে, কিন্তু একজন অতি বুদ্ধিমান মানুষ মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশল বা ‘মোটিভেটেড রিজনিং’-এর মাধ্যমে নিজের অনৈতিক আচরণকে সমাজের সামনে তো বটেই, এমনকি নিজের বিবেকের কাছেও অত্যন্ত যৌক্তিক ও অনিবার্য হিসেবে প্রমাণ করার অদ্ভুত ক্ষমতা রাখেন। ফলে তাদের দ্বারা সংঘটিত ক্ষতিগুলো অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী এবং ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
একত্রিত করলে দাঁড়ায়, মেধা হলো কেবল একটি তীব্র গতিসম্পন্ন ইঞ্জিনের শক্তি, কিন্তু সেই শক্তির অভিমুখ কোন দিকে হবে তা ঠিক করে দেয় নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ। একটি রাষ্ট্র বা সমাজ কেবল আইকিউ দিয়ে পরিচালিত হলে তা শেষ পর্যন্ত বৈষম্য আর নিখুঁত শোষণের চক্রে পরিণত হতে পারে।
তাই তথাকথিত ‘জিপিএ’ বা ‘গ্রেড’ সর্বস্ব মেধার পূজারী না হয়ে আমাদের পরিবার, বিদ্যাপীঠ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সহানুভূতি, সততা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। মেধা অর্জন করা সহজ, কিন্তু একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠা এক নিরন্তর সাধনা সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই সাধনাতেই আমাদের নজর দেওয়া জরুরি।