কল্পনা করুন এমন এক রূপকথার দ্বীপের কথা—চারপাশে অফুরন্ত নীল জলরাশি, নারিকেল গাছের সারি আর স্বচ্ছ প্রবালদ্বীপের মেলা। মানচিত্রের পাতায় সে এক বিন্দুর মতো ছোট দেশ। নাম তার টুভালু। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা ৯টি ছোট্ট প্রবালদ্বীপ নিয়ে গঠিত এই স্বাধীন রাষ্ট্রের মোট আয়তন মাত্র ২৬ বর্গকিলোমিটার! কিন্তু সেই চোখজুড়ানো সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক নির্মম ট্র্যাজেডি। পুরো দেশটির গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২ মিটার। বিশ্বজুড়ে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আর মাত্র কয়েক ফুট পানি বাড়লেই মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাবে টুভালু।
সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে টুভালুর প্রধানমন্ত্রী ফেলেতি তেও যখন বক্তৃতা দিতে মঞ্চে উঠলেন, তাঁর গলায় ছিল না কোনো রাজনৈতিক ভাষণ; বরং ছিল এক করুণ আকুতি। বিশ্বনেতাদের সামনে তিনি স্পষ্ট করেই বললেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি টুভালুর জন্য এখন আর দূরের কোনো আতঙ্ক নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের চোখ মেলে দেখার নিষ্ঠুর বাস্তবতা।”
পানিতে ডুবছে মাটি, তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম জমি
একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী বড় বড় শিল্পোন্নত দেশগুলোর বিষাক্ত কার্বন নিঃসরণ, অন্যদিকে বুকচাপা কষ্ট নিয়ে মাটি বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমেছে টুভালুর মানুষ। রাজধানী ফুনাফুতিতে চলছে সমুদ্র থেকে কৃত্রিম উপায়ে জমি পুনরুদ্ধারের বিশাল যজ্ঞ। প্রকৌশলীরা সমুদ্রের বুক চিরে বালি তুলে এ পর্যন্ত ১৫ দশমিক ৩ হেক্টর উঁচু ও বন্যামুক্ত জমি তৈরি করেছেন, আরও ১০ হেক্টর তৈরির কাজ চলছে। ২৬ বর্গকিলোমিটারের ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের জন্য এটি জীবনের স্পন্দনের মতো। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্র প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে সমুদ্রের সাথে বালি আর পাথরের যুদ্ধ করে কত দিন টিকে থাকা যাবে?
ভূখণ্ড হারালে আশ্রয় হবে ‘ডিজিটাল মহাকাশে’
টুভালুর সংকট নিয়ে বিশ্বজুড়ে যা সবচেয়ে বেশি তোলপাড় সৃষ্টি করেছে, তা হলো তাদের এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত। দেশটি বুঝতে পেরেছে, প্রকৃতি হয়তো তাদের মাটি কেড়ে নেবে। কিন্তু তারা তাদের হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় মুছে যেতে দেবে না। তাই তারা উদ্যোগ নিয়েছে সম্পূর্ণ দেশটিকে ডিজিটাল দুনিয়া বা মেটাভার্সে (Metaverse) রূপান্তর করার!
এর ফলে, যদি টুভালুর শেষ ইঞ্চি মাটিও প্রশান্ত মহাসাগরের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়, তাহলেও টুভালু টিকে থাকবে ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটিতে। টুভালুর নাগরিকেরা থ্রিডি হেডসেট বা ইন্টারনেটে প্রবেশ করে নিজেদের ভার্চ্যুয়াল দেশের রাস্তায় হাঁটতে পারবেন, ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান ও সংস্কৃতি চর্চা বজায় রাখতে পারবেন। এমনকি জাতিসংঘের কাছেও চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে, যেন ভূখণ্ড হারিয়ে গেলেও সমুদ্রসীমার আইনগত অধিকার ও একটি ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ হিসেবে তাদের স্বীকৃতি বজায় থাকে।
সাড়ে ৭ লাখ বর্গকিলোমিটারের অভিভাবক
বাস্তবে স্থলভাগ মাত্র ২৬ বর্গকিলোমিটার হলেও সমুদ্রসীমায় টুভালুর অধিকার প্রায় সাড়ে ৭ লাখ বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে! বিশাল এই সাগরের ওপর নির্ভর করে তাদের খাদ্য, অর্থনীতি আর টিকে থাকার লড়াই। টুভালুর প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, জলবায়ু অর্থায়নে শুধু ঋণের বোঝা না চাপিয়ে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিশ্ব তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না রাখলে কেবল টুভালু নয়, একের পর এক দ্বীপরাষ্ট্র হারিয়ে যাবে ইতিহাসের অতলে।
আয়তনে ছোট হলেও আজ বিশ্বকে জলবায়ু অভিযোজন ও আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে টুভালু। পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বেঁচে থাকার এমন অস্তিত্বের আকুতি মানুষ আগে কখনো দেখেনি। মানুষ হারিয়ে যাওয়ার আগেই কি বিশ্ব বিবেকের ঘুম ভাঙবে, নাকি কেবল ডিজিটাল পর্দায় থ্রিডি সিমুলেশন হয়েই বেঁচে থাকবে সুন্দর এই দেশ? উত্তর লুকিয়ে আছে কেবল সময়ের হাতে।