গরম তেলে ভাজা এবং মচমচে জিলাপি চিনির রসে ডুবাতেই যে মনকাড়া সুবাস ছড়ায়, তা মিষ্টিপ্রেমীদের জিভে জল আনতে বাধ্য। তবে জনপ্রিয় এই মিষ্টান্নটিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি ভীতি প্রচলিত—জিলাপি তৈরিতে নাকি ক্ষতিকর রাসায়নিক ‘হাইড্রোজ’ ব্যবহার করা হয়, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্রশ্ন উঠেছে, এই ধারণার সত্যতা কতটুকু এবং ‘হাইড্রোজ’ বলতে আসলে কী বোঝায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘হাইড্রোজ’ কোনো সুনির্দিষ্ট বিষাক্ত রাসায়নিকের নাম নয়। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিভাষায় এটি মূলত ‘হাইড্রোজেনেটেড উদ্ভিজ্জ ফ্যাট’, ‘বনস্পতি’ বা ‘শর্টেনিং’ বোঝাতে ব্যবহৃত একটি বাণিজ্যিক শব্দ। হাইড্রোজেনেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তরল তেলের গঠন পরিবর্তন করে সেটিকে জমাট বাঁধানো ফ্যাটে রূপান্তর করা হয়। আংশিক হাইড্রোজেনেশনের ফলে এতে তৈরি হতে পারে ক্ষতিকর শিল্পজাত ‘ট্রান্স ফ্যাট’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেলই প্রক্রিয়াজাত ট্রান্স ফ্যাটের প্রধান উৎস।
তবে সব দোকানে বা সব জিলাপিতেই যে বনস্পতি বা শর্টেনিং ব্যবহার করা হয়, তা নয়। অনেক স্থানে সাধারণ ভোজ্যতেল দিয়েও জিলাপি ভাজা হয়। জিলাপির রং, গন্ধ বা স্বাদ দেখে বাইরে থেকে কোন ফ্যাট ব্যবহার করা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই ‘সব জিলাপিই হাইড্রোজযুক্ত’—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
মূল উদ্বেগের বিষয় ‘হাইড্রোজ’ শব্দটি নয়, বরং খাদ্যে উপস্থিত ‘ট্রান্স ফ্যাট’। প্রক্রিয়াজাত ট্রান্স ফ্যাটের কোনো স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নেই; উল্টো এটি রক্তে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের (এলডিএল) মাত্রা বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনামতে, প্রতিদিনের মোট ক্যালরির ১ শতাংশের কম (২ হাজার ক্যালরির খাদ্যতালিকায় দৈনিক সর্বোচ্চ ২.২ গ্রাম) ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ করা উচিত।
একটি জিলাপি খেলেই যে শরীরে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে, বিষয়টি তা নয়। আসল সমস্যা লুকিয়ে আছে অতিরিক্ত ও নিয়মিত জিলাপি খাওয়ার অভ্যাসে। তেলে ভাজা এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত হওয়ায় জিলাপিতে ক্যালরির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এটি নিয়মিত খেলে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি ও রক্তে শর্করা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো—জিলাপি একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে এটিকে দৈনন্দিন খাবারের অংশ না বানিয়ে মাঝেমধ্যে অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে। পরিচ্ছন্ন ও ভালো মানের দোকান থেকে কেনা এবং মিষ্টি ও অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবারের বদলে শাকসবজি, ফল, বাদাম ও অসম্পৃক্ত স্বাস্থ্যকর ফ্যাটযুক্ত খাবারকে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রাধান্য দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।