দেশ থেকে পাচার হওয়া প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা উদ্ধারে ৪০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাজ করছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)সহ বিভিন্ন সংস্থা। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচারের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্তত ১০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
পাচার করা অর্থ ফেরাতে ইতোমধ্যে ‘সমন্বিত যৌথ টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে। বিএফআইইউ সূত্র জানায়, চিহ্নিত ৪০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনেকের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা হয়েছে। তদন্তের সুবিধার্থে কিছু হিসাবের জব্দের মেয়াদ দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। তালিকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উপদেষ্টা, আমলা ও ব্যবসায়ীরা রয়েছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর দেশে ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার সংখ্যা সাড়ে ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে বিএফআইইউ প্রায় ৪০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার হিসাবে থাকা ৩৫ হাজার কোটি টাকা অবরুদ্ধ করেছে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২ হাজার ৫০০টি হিসাবে ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ১৮৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ১২ হাজার কোটি টাকা অবরুদ্ধ করেছে।
৭৬ হাজার কোটি টাকা অবরুদ্ধ বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত শেখ হাসিনার পরিবার ও ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর ১১টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে ৫৭ হাজার কোটি এবং বিদেশে রয়েছে ১৯ হাজার কোটি টাকা।
এই ১১টি অগ্রাধিকার কেসের অধীনে শেখ হাসিনার পরিবারের ১৫৫টি এবং এস আলম পরিবারের ২২৭টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া অন্য ৪২টি গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। বিদেশে পাচার হওয়া টাকা উদ্ধারে বিদেশি ল ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং দেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারে আইনি পদক্ষেপ চলছে।
বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান, বিএফআইইউর কাজের গতি বাড়ানো হয়েছে। ১০টি বড় গ্রুপ ও শেখ হাসিনার পরিবারের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে। আরও কয়েকশ ব্যক্তি ও গ্রুপের ওপর নজর রাখা হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, সংস্থাটিকে পুনর্গঠন করতে উপপ্রধানকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে। বিএফআইইউকে সরাসরি আইনি ক্ষমতা দেওয়া হলে অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ উদ্ধার দ্রুত সম্ভব হবে।
সন্দেহজনক লেনদেন ও প্রতিবেদনের চিত্র চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে পর্যন্ত বিএফআইইউতে ২৭ হাজার ১৩০টি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) জমা পড়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩০ হাজার ১৯৯টি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৩৪৫টি এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪ হাজার ১০৬টি এসটিআর জমা হয়েছিল।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি ৭৯টি গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি এবং ৪৪০টি তথ্য বিনিময় করে, যার মধ্যে ২৯৭টি প্রকাশ করা হলেও ৪৩টি স্পর্শকাতর প্রতিবেদন অপ্রকাশিত রাখা হয়।
সরাসরি মামলা ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা নেই তদন্ত ও সতর্কবার্তা জারি করলেও বিএফআইইউর সরাসরি মামলা বা গ্রেপ্তারের আইনি ক্ষমতা নেই। সংস্থাটির তদন্ত প্রতিবেদন সিআইডি, দুদক ও এনবিআরের কাছে পাঠানো হয়। গত পাঁচ বছরে বিএফআইইউ দুদকের কাছে ৬২৩টি, সিআইডির কাছে ৪৩৫টি এবং এনবিআরের কাছে ৬৯৯টি মামলার তথ্য পাঠিয়েছে।
সংস্থাটিকে আরও কার্যকর করতে ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পুনর্গঠন করা হয় ‘ইন্টার-এজেন্সি টাস্কফোর্স অন স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’। এর আওতায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১১টি অগ্রাধিকার মামলার জন্য যৌথ তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়, যেখানে দুদককে প্রধান এবং সিআইডি ও এনবিআরকে সহযোগী সংস্থা করা হয়েছে।
পাচার করা অর্থ ফেরানোর চ্যালেঞ্জ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উন্নত দেশগুলো থেকে পাচার হওয়া অর্থের গড়ে মাত্র ১ শতাংশ ফেরত আনা সম্ভব হয়, যা করতে সাত-আট বছর বা তার বেশি সময় লাগে। বাংলাদেশ অতীতে সিঙ্গাপুর থেকে অর্থ ফেরত আনতে পেরেছিল, যাতে সাত বছর লেগেছিল।
তিনি আরও বলেন, যেসব দেশ পাচারের অর্থকে সুরক্ষা দেয় এবং যেসব ল ফার্ম এগুলোকে বৈধ্যতা দিতে সহায়তা করে, তাদের সাথে আলোচনা করা প্রয়োজন।
এদিকে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, অস্ট্রিয়া, মাল্টা, তুরস্কসহ নয়টি দেশের বিভিন্ন শহরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পাচারকৃত সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন জানান, পাচার করা অর্থের যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তার আইনি ভিত্তি তৈরি করা দরকার। এর জন্য প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদা মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স চুক্তি করা এবং ডকুমেন্টের মাধ্যমে পাচারের প্রক্রিয়া প্রমাণ করা জরুরি।
নথির তথ্য অনুযায়ী, সরকার পরিবর্তনের পর ৬ শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ৯ হাজারের বেশি হিসাব এবং শেয়ার জব্দ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কিছু হিসাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১ হাজার ৩৭৪টি ব্যাংক হিসাবে ৬১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং ১৮৮টি বিও হিসাবে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ ছিল। অন্যদিকে, দুদকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক হিসাবগুলোতে ২২,২২৬ কোটি টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে।