শনিবার , ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি

খেলাপি ঋণে বিশ্বসেরা বাংলাদেশ : পেছনে পড়ল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনও

Writer
বাংলা পত্রিকা ডেস্ক
03 Sep, 2026 09:17 PM 8 বার পঠিত 1 মিনিট পড়ার সময়

ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের ভারে এখন বিশ্বতালিকায় সবার উপরে বাংলাদেশের নাম। দেশে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে খেলাপি ঋণের হারে শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে আফ্রিকার দুই দেশ চাদ ও ইকুয়েটোরিয়াল গিনি। এতদিন শীর্ষে থাকা ইউক্রেন তাদের খেলাপি ঋণের পাহাড় কমিয়ে তালিকায় অনেক নিচে নেমে এলেও, বাংলাদেশে উল্টো আড়ালে থাকা ঋণগুলো প্রকাশ্যে আসায় পরিস্থিতির ভয়াবহ রূপ প্রকাশ পেয়েছে।

শীর্ষ পাঁচ দেশের চিত্র

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল সাউন্ডনেস ইন্ডিকেটর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ খেলাপি ঋণের হারে শীর্ষ দেশগুলো হলো:
১. বাংলাদেশ: ৩২.৭৮%
২. চাদ: ৩১.৫১% (২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী)
৩. ইকুয়েটোরিয়াল গিনি: ৩০%
৪. আলজেরিয়া: ২০.০৫%
৫. ঘানা: ১৮.১১%

বাংলাদেশের গলার কাঁটা ৬ লাখ কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাবে দেওয়া বেনামি ঋণ, জালিয়াতি এবং পুনঃ তফসিলের মাধ্যমে কাগজে-কলমে ঋণ ‘নিয়মিত’ দেখানোর যে সংস্কৃতি ছিল, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসছে। বিশেষ করে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়; যেখানে বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশই এখন খেলাপি।

ইউক্রেন যা পারল, বাংলাদেশ কেন পারল না?

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধরত থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেন তাদের ব্যাংক খাত সংস্কারে অবিশ্বাস্য সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৩ সালে দেশটিতে খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ। কিন্তু মাত্র দুই বছরে তারা এটি কমিয়ে ১২.৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

ইউক্রেন মূলত তিনটি কৌশল অবলম্বন করেছে: পুরোনো খেলাপি ঋণ ব্যালান্স শিট থেকে অবলোপন (Write-off) করা, কঠোরভাবে ঋণ আদায় এবং ভালো মানের নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ানো। এমনকি পাওনা আদায়ে তারা আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত গিয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’র মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আড়াল করা হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানের শ্রেণীকরণ নিয়ম চালু করায় এবং অডিট শুরু হওয়ায় লুকানো ক্ষতগুলো বেরিয়ে আসছে। ফলে ইউক্রেন যখন উন্নতির পথে, বাংলাদেশ তখন অবনতির অতলে।

কেন এই ধস?

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের অভাবই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন, যা আর ফেরত আসেনি। এছাড়া জ্বালানি সংকট ও ব্যবসায়িক মন্দার অজুহাতেও অনেকে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ শোধ করছেন না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্যাংক খাত সংস্কারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বেশ কিছু ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং আইএমএফ-এর পরামর্শে আন্তর্জাতিক মানের তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, খেলাপি ঋণের এই বিশ্বরেকর্ড বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপদ সংকেত। তাদের মতে, শুধু কাগজে-কলমে নিয়ম পরিবর্তন করলে হবে না; বরং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সম্পদ জব্দ করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ আদায় নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়বে।


একনজরে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ

  • মোট খেলাপি ঋণ: ৬,০৬,৫৫৫ কোটি টাকা।

  • খেলাপির হার: ৩২.৭৮%।

  • সবচেয়ে খারাপ অবস্থা: একীভূত হওয়া ৫টি ব্যাংক (খেলাপি ৮০% এর বেশি)।

  • উত্থান: ২ বছরে ২.১১ লাখ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ লাখ কোটি ছাড়িয়েছে।

ট্যাগ: অর্থনীতি