বরিশালে দৈনিক সমকালের সাবেক ব্যুরো প্রধান ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির (৫৭) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মরদেহের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া পাঁচটি চিরকুটে দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা, যন্ত্রণা ও জীবনের নানা আক্ষেপের কথা উঠে এসেছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেস্বর) সন্ধ্যায় নগরীর প্যারারা রোডে সমকালের ব্যুরো অফিস থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের বরাতে পুলিশ জানায়, বরিশালের সাবেক এই ব্যুরো প্রধান প্রায় তিন বছর আগে সমকাল থেকে চাকরিচ্যুত হন। তিনি বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এর আগে দীর্ঘদিন দৈনিক যুগান্তরেও কাজ করেছেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও এক কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।
উদ্ধার হওয়া চিরকুটগুলোর একটিতে তিনি নিজের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি বেশকিছু রোগে আক্রান্ত। এই যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারছি না। অসুস্থতার কারণে আমি সামাজিকভাবেও পিছিয়ে পড়েছি। রোগের যন্ত্রণা সহ্য না করতে পেরে আমি আত্মহত্যা করলাম। এজন্য কাউকে যাতে হয়রানি না করা হয়।’
সমকালের বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্বে থাকা সুমন চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে লেখা অপর এক চিরকুটে তিনি বলেন, ‘তোমার সঙ্গে একসাথে দেড় যুগ কাজ করেছি। কখনো কোনো কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করিও। তোমাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য দুঃখিত। যদি পারো দৈনিক সমকাল পত্রিকায় আমার পাওনা টাকা আদায় করে তোমার বৌদির হাতে দিও।’
স্ত্রী প্রিয়াঙ্কাকে উদ্দেশ্য করে তিনি লেখেন, ‘প্রিয়াঙ্কা আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। প্রকৃতিকে (মেয়ে) দেখে রেখো এবং লেখাপড়া চালিয়ে যেও। দীপকের (ভাই) সাথে থেকো, ও তোমাদের আগলে রাখবে।’
ছোট ভাই দীপক চ্যাটার্জির উদ্দেশে লেখা চিরকুটে বলা হয়, ‘আমাকে ক্ষমা করিস। তোর ওপর অনেক বোঝা চাপিয়ে গেলাম। প্রিয়াঙ্কা ও প্রকৃতিকে আগলে রাখিস।’
প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ্য করে শেষ চিরকুটে তিনি লেখেন, ‘আমি যেহেতু স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করেছি তাই ময়নাতদন্তের প্রয়োজন নেই। প্রশাসনিক ঝামেলা ছাড়া আমার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করিও। তোমার সাথে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। আমার স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা ও প্রকৃতির খেয়াল রাখিও। বিদায়।’
ঘটনার বিবরণে সমকালের স্টাফ রিপোর্টার সুমন চৌধুরী জানান, চাবি থাকায় পুলক চ্যাটার্জি প্রায়ই অফিসে এসে সময় কাটাতেন। শুক্রবার বিকেলে তার স্ত্রী ফোন না পাওয়ার কথা জানালে সন্ধ্যায় অফিসে গিয়ে ভেতর থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান তিনি। পরে দরজার ফাঁক দিয়ে ফাঁস লাগানো অবস্থায় মরদেহ ঝুলতে দেখে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ ও সিআইডির একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
পুলিশ কমিশনার জানান, ঘটনাস্থল থেকে চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা মনে হলেও বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের পর প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম জানান, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।