Busimess

এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ২৪টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বহুল আলোচিত রিট মামলায় নিজেদের আইনজীবী পরিবর্তন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে নতুন আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে আগের আইনজীবীর কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সংগ্রহ করেছে। অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংকও তাদের বর্তমান আইনজীবীকে সরিয়ে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছিলেন ব্যারিস্টার শামীম খালেদ আহমেদ। সম্প্রতি তাকে পরিবর্তন করে অন্য এক আইনজীবীকে দায়িত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যারিস্টার শামীম খালেদ গণমাধ্যমকে জানান, তিনি ইতোমধ্যে এনওসি দিয়েছেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন আইনজীবী নিয়োগ করেছে।

এদিকে, ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গত ১১ আগস্ট তাকে চিঠি দিয়ে অনাপত্তিপত্র চেয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংক এই মামলায় নতুন আইনজীবী নিয়োগ করতে চায়।


শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। এতে অভিযোগ করা হয়, এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ২৪টি প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকা দিয়েই ব্যাংকটির ৮২ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা দখল করেছে।

প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট গত বছরের অক্টোবরে এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) একটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৪২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন এবং একটি অডিট রিপোর্ট জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে ব্যাংকের শেয়ার জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং এস আলম গ্রুপের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে।

তদন্তে বলা হয়, ২০১৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সরাসরি রাজনৈতিক মদদে ব্যাংক কোম্পানি আইনের তোয়াক্কা না করে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৭২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। জালিয়াতির মাধ্যমে শেয়ার কেনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘জেএমসি বিল্ডার্স’, যার চেয়ারম্যান এস আলমের ছেলে আহসানুল আলম।


বিএফআইইউর প্রতিবেদনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংশ্লিষ্টতা। তদন্ত অনুযায়ী, জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন ২০১৭ সালের ৮ জুন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত হন। তিনি ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ওই পদে বহাল ছিলেন।

রিট আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মো. সাহাবুদ্দিন যখন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন, সেই সময়েই এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, জেএমসি বিল্ডার্সের নিজস্ব মূলধন মাত্র ১০ কোটি টাকা হলেও তারা ব্যাংক থেকে ১০২ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে, যার অর্থের জোগান দিয়েছিল স্বয়ং এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি।


রিট মামলাটি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন। সম্প্রতি মামলাটি শুনানির জন্য তালিকায় এলে হাইকোর্টের একজন বিচারপতি বিব্রতবোধ (Recuse) করেন। নিয়ম অনুযায়ী, মামলাটি পরে প্রধান বিচারপতির দপ্তরে পাঠানো হয় এবং বর্তমানে এটি অন্য একটি বেঞ্চে শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহেই মামলাটি নতুন বেঞ্চে শুনানির জন্য আসতে পারে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আইনি লড়াইয়ে এই আইনজীবী পরিবর্তনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।