মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন লড়াইয়ের গর্জন, আর তখন তার তপ্ত আঁচ গিয়ে লাগছে আটলান্টিকের ওপারে মার্কিন মুলুকের সাধারণ মানুষের পকেটে। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত এখন আর কেবল ভূরাজনৈতিক মানচিত্রের লড়াই নেই; তা রূপ নিয়েছে মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধের আশঙ্কায়। যুদ্ধের জেরে জ্বালানির বাড়তি দাম মেটাতে গিয়ে ইতিমধ্যে মার্কিন ভোক্তাদের পকেট থেকে অতিরিক্ত ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) ডলারের বেশি বেরিয়ে গেছে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের ‘ক্লাইমেট সলিউশনস ল্যাব’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে পেট্রল ও ডিজেলের পেছনে মার্কিন নাগরিকদের এই বিশাল অঙ্কের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
প্রতি দুই মিনিটে গচ্ছা যাচ্ছে ১০ লাখ ডলার
গবেষণার হিসাবটি চমকে দেওয়ার মতো। বর্তমানে যে গতিতে জ্বালানির দাম বাড়ছে, তাতে প্রতি দুই মিনিটে মার্কিন ভোক্তাদের অতিরিক্ত ১০ লাখ ডলার গুনতে হচ্ছে। যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত একটি গড়পড়তা মার্কিন পরিবারকে কেবল জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় মেটাতে ৭৬০ ডলারের বেশি খরচ করতে হয়েছে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বলছেন, ১০০.৪ বিলিয়ন ডলারের এই হিসাবটি একটি তুলনামূলক চিত্র। যুদ্ধ না হলে জ্বালানির দাম কেমন থাকত এবং যুদ্ধের কারণে বর্তমানে দাম কত এই দুইয়ের ব্যবধান থেকেই অতিরিক্ত ব্যয়ের এই খতিয়ান তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু পেট্রলেই বাড়তি খরচ হয়েছে ৫৫.০১ বিলিয়ন ডলার।
গ্যাস স্টেশনে অস্বস্তি
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ব্যক্তিগত গাড়ি। কিন্তু গ্যাস স্টেশনগুলোতে এখন তেলের দাম দেখে কপালে ভাঁজ পড়ছে সাধারণ মানুষের। সাম্প্রতিক শ্রমিক দিবসের ছুটিতে দেখা গেছে, দেশজুড়ে নিয়মিত গ্যাসোলিনের গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৪.১৪ ডলারে ঠেকেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক ডলার বেশি। অন্যদিকে, ডিজেলের দাম বেড়ে হয়েছে ৫.৮৫ ডলার। শতাংশের হিসেবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গ্যাসোলিনের দাম ৩৯ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির পুরো দায় কেবল যুদ্ধের নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও চাহিদা, মজুত পরিস্থিতি এবং পরিবহন ঝুঁকির মতো বিষয়গুলোও এখানে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
পণ্য ও সেবায় বাড়তি খরচের শঙ্কা
জ্বালানির এই দাম বৃদ্ধি কেবল ব্যক্তিগত গাড়ির চাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাক ও লরির মাধ্যমে পণ্য পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কৃষি ও নির্মাণ খাতে। পণ্যবাহী যানের খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার বোঝা সাধারণ ক্রেতার ওপরই পড়ে। ফলে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
উদ্বেগের কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালি
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই প্রণালি ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আতঙ্ক বিরাজ করছে বাজারে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলারে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ৯৩ ডলার ছুঁইছুঁই। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আধুনিক বিশ্বের যুদ্ধগুলো কেবল নির্দিষ্ট কোনো সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর আর্থিক ধাক্কা সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত।
(তথ্যসূত্র: ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়, অ্যাক্সিওস ও রয়টার্স)