সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ শীর্ষ মুসলিম ধর্মীয় কর্মকর্তা আহমেদ বদরউদ্দিন হাসুনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দেশটির প্রায় ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের দায়ে আদালত তার বিরুদ্ধে এই সাজা ঘোষণা করেছেন।
সহিংসতায় উসকানি, হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দান এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ একাধিক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে সোমবার দামেস্কের চতুর্থ অপরাধ আদালত হাসুনের বিরুদ্ধে ওই রায় ঘোষণা করেছেন।
২০০৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সিরিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হাসুনকে ২০২৫ সালের মার্চে দামেস্ক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর এক মাস আগে তিনি আত্মগোপন থেকে প্রকাশ্যে আসেন। গত ২৫ জুন তার বিচার কাজ শুরু হয়।
হত্যাকাণ্ডে উসকানি দেওয়ার অপরাধে ২০ বছরের কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগে হাসুনকে একাধিক মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। হত্যাকাণ্ড দীর্ঘায়িত করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় বিচারক তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ডও দিয়েছেন। এই মুসলিম ধর্মীয় নেতাকে একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
দামেস্কের চতুর্থ অপরাধ আদালতের বিচারক ফখরুদ্দিন আল-আরিয়ান বলেন, আসাদের শাসনামলে সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানগুলোর ধর্মীয় বৈধতা দিতে হাসুন এবং তার নেতৃত্বাধীন সরকারি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, বেসামরিক এলাকায় ব্যারেল বোমা হামলা চালানোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন আসাদের এই ঘনিষ্ঠ মুফতি। ব্যারেল বোমা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায় এবং এই বোমার ব্যবহার আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
আদালত বলেছেন, হাসুন তার ধর্মীয় বক্তৃতায় সিরিয়ার সামরিক কর্মকর্তা ও সৈন্যদের দেশের বিরোধীদের মোকাবিলা করার এবং সিরিয়ার সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে পূর্ব আলেপ্পোর বেসামরিক নাগরিকদের ঘরবাড়ি খালি করার প্রকাশ্য আহ্বান জানিয়েছিলেন।
যেসব এলাকা থেকে বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল, সেসব এলাকা ‘নির্মূল ও ধ্বংস’ করার জন্য তিনি সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান এবং ইদলিবের জনগণকে হত্যা ও বাস্তুচ্যুত করার হুমকি দেন।
হাসুন যে অপরাধগুলো করেছেন তার গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি যেকোনো সাধারণ বা বিশেষ ক্ষমার আওতামুক্ত থাকবেন বলে আদালত নিশ্চিত করেছেন। আদালত বলেছেন, সরকারি কোষাগারের সুবিধা নেওয়ায় মুফতি হাসুনের যাবতীয় অর্থ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবে রাষ্ট্র।
এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে দেশটির বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি বলেছেন, জনগণের অধিকার রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব; যা স্বাধীনতার প্রথম চিহ্নের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল এবং যার প্রতিধ্বনি আজও মিলিয়ে যায়নি।
২০০২৪ সালে আসাদের পতনের পর থেকে সিরিয়ায় যে রূপান্তরকালীন বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে; সেখানে হাসুনকে একটি ‘ব্যতিক্রমী’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন দামেস্ক থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি হেইডি পেট।
তিনি বলেন, অন্যান্য মামলার অভিযুক্তরা ছিলেন সাবেক শাসকগোষ্ঠীরই উচ্চপদস্থ সদস্য, যাদের অনেকেই আবার আসাদ পরিবারের লোক। হেইডি বলেন, আমরা সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ও তার দুই চাচাতো ভাইকে মৃত্যুদণ্ড পেতে দেখেছি। তবে শেখ আহমেদ হাসুনই প্রথম সুন্নি মুসলিম, যার বিচার হলো এবং সিরিয়ায় এখনও তার কিছুটা সামাজিক সমর্থন রয়েছে।
আল জাজিরার এই প্রতিনিধি বলেন, হাসুনের বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অনলাইনে তার সমর্থকরা দাবি করছেন। তবে সমালোচকদের অনেকেই তার মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছিলেন।
সূত্র: আল জাজিরা, এএফপি।