চাল উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থান অর্জন করে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তায় জোরালো সাফল্য দেখালেও, দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য গমের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। স্থানীয় উৎপাদন সীমিত থাকায় গমের চাহিদার বড় অংশই মেটাতে হচ্ছে বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৭ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯ লাখ টন। বিপরীতে গত অর্থবছর (২০২৫-২৬) স্থানীয়ভাবে চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ২৪ লাখ টন, যা চাহিদার তুলনায় ১ কোটি টনের বেশি। অন্যদিকে বছরে প্রায় ৮০ লাখ টন গমের চাহিদার বিপরীতে গত অর্থবছর উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ২৩ হাজার টন। গত প্রায় ১৭ বছর ধরেই দেশের বার্ষিক গড় গম উৎপাদন এই ১১ লাখ টনের ঘরে আটকে আছে। ফলস্বরূপ, গত অর্থবছরে বিদেশ থেকে প্রায় ৬৫ লাখ ৮১ হাজার টন গম আমদানি করতে হয়েছে; অর্থাৎ দেশের চাহিদার মাত্র ১৪-১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও বাকি ৮৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর।
বাড়ছে গমের ব্যবহার ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, গত ছয় বছরে গমের তৈরি খাবারের ব্যবহার প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। স্বাস্থ্যসচেতনতা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের ফলে শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই রুটি, পাউরুটি, বিস্কুট ও নুডলসের মতো পণ্যের কদর বেড়েছে। তবে আমদানিনির্ভরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশে আটা-ময়দার দাম হু হু করে বেড়েছে। গত এক বছরে প্যাকেটজাত আটা-ময়দার দাম ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
টিসিবি ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমান বাজারে প্যাকেটজাত ময়দা প্রতি কেজি ৮৫-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি গুদামে রেকর্ড ১৯ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ টন চালের মজুত থাকায় চালের বাজারদর বেশ স্থিতিশীল এবং কিছু ক্ষেত্রে তা গত বছরের তুলনায় কমেছে।
খাদ্যনিরাপত্তায় উদ্বেগ ও উৎপাদনের অন্তরায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গত সেপ্টেম্বরের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে চাল উৎপাদনে স্বস্তির কথা বলা হলেও গমের আমদানিনির্ভরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এফএওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিডব্লিউএমআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ রেজাউল কবীর জানান, গত এক দশকে গমের উৎপাদনশীলতা ও নতুন জাত এলেও শীতকালীন সময়ে অধিক লাভজনক ফসল হিসেবে আলু ও ভুট্টার দিকে ঝুঁকেছেন কৃষকরা। পাশাপাশি জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব, ব্লাস্ট রোগ এবং ইঁদুরের উপদ্রব গম চাষ হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারিভাবে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ, নতুন জাতের বিস্তার এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে আমদানিনির্ভরতার এই চাপ কমানো সম্ভব।
