দেড় বছরেরও কম সময়ে সিটি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর প্রায় ৩৬৪ শতাংশ বেড়ে ২৮ টাকা থেকে ১৩০ টাকার ঘরে পৌঁছালেও এর পেছনে কোম্পানির কোনো মৌলিক বা মৌলভিত্তির উন্নতি ছিল না। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তদন্তে উঠে এসেছে, এই অস্বাভাবিক উত্থানের নেপথ্যে কাজ করেছে সংঘবদ্ধ কারসাজির নানা কৌশল। ধারাবাহিক কেনাবেচা বা সিরিজ ট্রেডিং, স্বজনদের হিসাবে বিপরীতমুখী লেনদেন, প্রকৃত মালিকানা অপরিবর্তিত রেখে শেয়ার হাতবদল এবং মাত্র কয়েক সেকেন্ডে বিপুল শেয়ার কিনে কৃত্রিম উপায়ে দর বাড়ানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
ডিএসইর তদন্তকারীরা ২০২৫ সালের ৪ মে থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিটি ইন্স্যুরেন্সের লেনদেন পর্যালোচনা করেছেন। এ সময় শেয়ারটির দর ২১০ শতাংশের বেশি বেড়ে ৮৭ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়ায় এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর তা ১৩০ টাকা ২০ পয়সায় উন্নীত হয়। তদন্তে দেখা যায়, এই বিপুল লেনদেন ও কারসাজির প্রায় অর্ধেকই কেন্দ্রীভূত ছিল নির্দিষ্ট কয়েকটি পক্ষ ও প্রতিষ্ঠানের হাতে।
আইন ভেঙেছে আনোয়ার গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান শেয়ারের এই অস্বাভাবিক লেনদেনে বড় অঙ্কের কেনাবেচায় জড়িয়েছে আনোয়ার গ্রুপসংশ্লিষ্ট দুটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান—আনোয়ার গ্যালভানাইজিং ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্স। এর মধ্যে আনোয়ার গ্যালভানাইজিং নিষিদ্ধ সময়ে শেয়ার লেনদেন করেছে এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্স কোনো রকম পূর্বঘোষণা ছাড়াই বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনাবেচা করেছে। দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই আনোয়ার পরিবারের সদস্য হোসেইন মেহমুদের যোগসূত্র রয়েছে।
সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর মাসে সিটি ইন্স্যুরেন্সের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুমোদনের আগের নিষিদ্ধ সময়ে আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের হিসাব থেকে দফায় দফায় শেয়ার কেনাবেচা ও স্থানান্তর করা হয়, যা বিএসইসির সুবিধাভোগী ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা লঙ্ঘন করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ ফাইন্যান্স সিকিউরিটিজের মাধ্যমে প্রায় ৪২ লাখ শেয়ার কেনাবেচা করলেও কোনো করপোরেট ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এর আগে আরেকটি কারসাজির ঘটনায় বিএসইসি আনোয়ার গ্যালভানাইজিংকে জরিমানা করেছিল।
রহস্যময় দুই প্রতিষ্ঠান ও লেনদেনের নানা কৌশল সিটি ইন্স্যুরেন্সের মোট লেনদেনের প্রায় ৩০ শতাংশই সম্পন্ন হয়েছে দুটি রহস্যময় প্রতিষ্ঠান—সিনিয়র ট্রেডিং ও নিলফা ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে। মো. ইদ্রিস আলীর প্রতিনিধিত্বকারী সিনিয়র ট্রেডিং প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ শেয়ার লেনদেন করে প্রায় ১৯ কোটি টাকা মুনাফা তুললেও বিও হিসাবে দেওয়া ঠিকানায় তাদের কোনো কার্যালয় খুঁজে পায়নি ঢাকা স্ট্রিট জার্নাল। একইভাবে নিলফা ট্রেডিং এবং আতাহার ইশরাক শাবাব চৌধুরীর মতো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাজারে উপলব্ধ সব শেয়ার কিনে নিয়ে কৃত্রিমভাবে দর বাড়িয়েছে।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, একই ব্যক্তির একাধিক হিসাব এবং স্বজনদের মধ্যে বিপরীতমুখী লেনদেনের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা অপরিবর্তিত রেখে শেয়ার হাতবদল করা হয়েছে। কায়সার কাফি রেমন ও তাঁর স্বজনদের হিসাবে এ ধরনের ২৪টি সন্দেহজনক লেনদেন পাওয়া গেছে। পাশাপাশি এসবিএসি ব্যাংক ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে একই ট্রেডিং ওয়ার্কস্টেশন থেকে বিপরীতমুখী আদেশ কার্যকরের ঘটনাও ধরা পড়েছে।
সব মিলিয়ে সিটি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর বৃদ্ধির আড়ালে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি, সংঘবদ্ধ কারসাজি এবং নানামুখী বিধিলঙ্ঘনের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম জানিয়েছেন, সিটি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার লেনদেন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে এবং অনিয়মের প্রমাণ পেলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্র: ঢাকা স্ট্রিট জার্নাল
