ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দপ্তরের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তবে যোগদানের পর থেকেই তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আজ মঙ্গলবার ২২ দিনের মতো চুয়েটে অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে।
আজ সকাল সাড়ে ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা নতুন উপাচার্যকে তাঁর দপ্তরে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন উপাচার্যের পদত্যাগ ও সাবেক উপাচার্যের পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
চুয়েটের এই দীর্ঘায়িত সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না থাকায় নানা প্রশ্ন উঠছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কারও কারও ধারণা, এই আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক যোগসূত্র থাকতে পারে। এর আগে গত মে মাসে গাজীপুরে অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের পেছনেও রাজনৈতিক ইন্ধন ছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনা করেই তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে নেমেছেন। এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সম্পর্ক নেই।
চুয়েটের একাধিক সূত্রের দাবি, উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়তে পারে। পছন্দের শিক্ষককে দায়িত্বে বসানো বা সরানোর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের হাত রয়েছে বলে ক্যাম্পাসে জোর আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া চুয়েটের নিজস্ব কোনো শিক্ষককে উপাচার্য না বানিয়ে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
উল্লেখ্য, চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে গত ২৭ জুলাই উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে কুয়েটের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওই রাতেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা উপাচার্যের বাসভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক শাটডাউন। পরবর্তীতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতি পালন শুরু করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের পাঠদান ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়।
সংকট নিরসনে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চাইলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একটি প্রশাসনিক পদ। কাকে দায়িত্ব দিলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, তা সরকারই বিবেচনা করবে। শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষা–সংক্রান্ত দাবিতে আন্দোলন হতে পারে, তবে উপাচার্য পরিবর্তন নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সমীচীন নয়।’ তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, আন্দোলনের নেপথ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
তবে আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থী জানান, যদি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকত, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে রাজপথে নামতেন না। তিনি বলেন, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে স্বস্থানে পুনর্বহাল করাই একমাত্র সমাধান।
চুয়েট-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সেশনজটের ঝুঁকি বাড়ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই অচলাবস্থা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
