সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এই দুই মাসে সঞ্চয়পত্রে মানুষের নিট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ১ হাজার ৫৭২ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের আগস্টে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে ৪০৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আগের বছরের একই মাসে যা ছিল ২৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে নিট বিক্রি বেড়েছে ১২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর আগে গত জুলাইয়ে নিট বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি থেকে মেয়াদ পূর্তির পর আসল পরিশোধের অবশিষ্ট অংশকে বলা হয় নিট বিক্রি। নিট বিক্রি বাড়ার অর্থ হলো, সরকারের কাছে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে আগের তুলনায় বেশি অর্থ জমা হচ্ছে।
খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অনেক বিনিয়োগকারী ব্যাংকের পরিবর্তে সঞ্চয়পত্রকে তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। তবে কেবল নিট বিক্রি বাড়লেই সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ক্ষমতা বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, ব্যাংকিং খাত নিয়ে কিছু উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় তিনি নতুন করে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছেন। তাঁর মতো অনেকেই এখন নিরাপদ বিকল্পের খোঁজে সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, "সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ার অর্থ আমানতকারীদের মোট সঞ্চয় বৃদ্ধি পাওয়া নয়। ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থার কিছুটা ঘাটতি থেকে অনেকে আমানত সঞ্চয়পত্রে রূপান্তর করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।"
তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়াকে ব্যাংকের প্রতি আস্থা কমার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ, ব্যাংকগুলোতেও আমানতের পরিমাণ বাড়ছে। মূল বিষয় হলো, একজন আমানতকারী কোথায় অর্থ রাখবেন, তা তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।’
মুনাফার হার ১২ শতাংশের কাছাকাছি
বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে সুদের বা মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মেয়াদে এই হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
এদিকে সঞ্চয়পত্রে বিক্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের ঋণ পরিশোধের দায়ও বাড়ছে। গত আগস্ট শেষে সঞ্চয়পত্রের পুঞ্জীভূত স্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। গত জুনের শেষে যা ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যেখানে অর্থবছর শেষে নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছিল ৪৩৬ কোটি টাকায়।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক। অর্থাৎ ওই দুই অর্থ বছরে সঞ্চয়পত্রের নতুন বিক্রির চেয়ে পুরোনোর আসল ও মুনাফা পরিশোধের পরিমাণ বেশি ছিল।
