প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আশপাশে থাকা ব্যক্তিদের দ্বৈত নাগরিকত্ব ও বিদেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের পকেটে সব সময় ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট থাকে। দেশে কোনো সংকট তৈরি হলে তাঁরা আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবেন।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে মোহাম্মদপুরে এনসিপির এক পথসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে থাকা ব্যক্তিদের কেউ দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী, কারও বিদেশের ভিসা রয়েছে, আবার কারও কাছে সব সময় ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট প্রস্তুত থাকে। তাঁদের অনেককে মানুষ আগে দেখেনি, ভবিষ্যতেও হয়তো দেখবে না। দেশে কোনো সংকট দেখা দিলে তাঁরা টিকিট নিয়ে আগের জায়গায় চলে যাবেন।
তিনি বলেন, লন্ডন থেকে আসা কয়েকজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ মহলে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর দাবি, ওই ব্যক্তিরাও মনে করেন, তাঁরা দুই বছরের বেশি ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে পারবেন না।
সংসদ সদস্য বলেন, যাঁরা তাঁদের ভোট দিয়েছেন, তাঁদের অনেকের প্রত্যাশা ছিল পাঁচ বছর সরকার থাকবে। কিন্তু এখন ভুল বুঝতে পেরে কেউ কেউ অনুশোচনা করছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের ব্যক্তিরা জনসমক্ষে এসে অনুশোচনা প্রকাশ করতে পারবেন না বলে যতটা সম্ভব লুটপাট করে বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সন্ত্রাসীরা মন্ত্রী হয়েছেন, নাকি মন্ত্রীরাই সন্ত্রাসী হয়ে উঠেছেন—এমন দুটি সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, হয় সন্ত্রাসীদের মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হয়েছে, নয়তো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে মন্ত্রীরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র হাতে মাঠে নামার প্রয়োজন অনুভব করছেন।
তিনি আরও বলেন, একজন প্রতিমন্ত্রীকে যদি নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র হাতে মাঠে নামতে হয়, তাহলে বিষয়টির গভীরে গিয়ে দেখা দরকার। তাঁর মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে একজন প্রতিমন্ত্রীকে এভাবে অস্ত্র নিয়ে নামতে হতো না। সরকারের যাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অন্যদের জবাবদিহির মুখোমুখি করে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হাসনাত আবদুল্লাহ মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পদত্যাগ দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবিধানিক শপথ ভঙ্গ করেছেন। নিজের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের পরিবর্তে তিনি অন্য কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছেন বলেও দাবি করেন এই সংসদ সদস্য।
বিএনপির অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে হাসনাত বলেন, দলটির ইতিহাসে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির নেই। তাঁর ভাষায়, আওয়ামী লীগ চুরি করে সফল হয়েছে, আর বিএনপি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে—দুই দলের মধ্যে পার্থক্য এটুকুই।
বিএনপির নির্যাতন-নিপীড়নের ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশকে বর্তমান পথে এগিয়ে নেওয়া হলে এক-এগারোর পেছনের কারণগুলো নিয়েও মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোচনা হবে। বিএনপিকে নির্যাতিত ও নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপনের পাশাপাশি হাওয়া ভবন, দুর্নীতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বানচালের অভিযোগগুলোও খতিয়ে দেখা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
১৯৯৬ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ওই বছর একচ্ছত্র ও নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। পরে আবার নির্বাচন দিতে হয়। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারব্যবস্থাটিকে বিতর্কিত করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিএনপির অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে দলটিকে প্রশ্নের মুখোমুখি করার আহ্বান জানান তিনি।
চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি নিয়ে বক্তব্যে হাসনাত বলেন, বিএনপির সবাই এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। তবে যাঁরা চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি করছেন কিংবা সরকারি কার্যালয়গুলোকে দলীয়করণ করছেন, তাঁরা বিএনপির সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জীবনযাপন নিয়েও মন্তব্য করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত কুমড়ার ভর্তা ও সবজি খান এবং রাতে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমান বলে শোনা যায়। বিরোধী দলে থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাঁদের সহমর্মিতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারেক রহমান বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হওয়ায় তাঁর প্রতি আন্তরিকতা রয়েছে।
হাসনাতের দাবি, পর্যাপ্ত ঘুম ও পুষ্টিকর খাবারের অভাব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের বেতনভুক্ত ব্যক্তিরা তাঁর জীবনযাপনের এসব বিষয়কে প্রশংসা করলেও বাস্তবে তাঁকে অস্বাস্থ্যকর রুটিনে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে। এ সুযোগে অন্যরা দুর্নীতি ও লুটপাটে জড়িয়ে পড়ছেন, অথচ প্রধানমন্ত্রী তা বুঝতে পারছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে থাকা দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। তাঁর বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ, ঘের দখল ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ ছিল বলে দাবি করেন তিনি। এমন একজন ব্যক্তিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সমালোচনা করেন এই সংসদ সদস্য।
সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে হাসনাত বলেন, নিজেকে অতিরিক্ত চালাক ভাবার প্রয়োজন নেই। তাঁর দাবি, একসময় নিজ দলের লোকজনই তাঁর কর্মকাণ্ডের বিচার করবেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে নির্যাতনের শিকার বিএনপির নেতা-কর্মীদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পেছনে সালাহউদ্দিন আহমদের ভূমিকা রয়েছে বলে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী মনে করেন।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দাদের উদ্দেশে বক্তব্যে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, এলাকাটি নানা নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত। এসব সমস্যা সমাধানে তাঁরা কাজ করতে চান। ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় মানুষ ভয়ভীতির কারণে নিজেদের সমস্যার কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, নিপীড়িত মানুষ নীরব থাকলেও তাদের সামান্য প্রতিবাদও নিপীড়কের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।
