বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ ঋণের বোঝা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব ও কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ সভায় বিশ্বের ১৯১টি সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলা, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, উন্নয়ন অর্থায়ন বাড়ানো, দারিদ্র্য হ্রাস এবং প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়গুলো আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে।
পাশাপাশি, বার্ষিক সভা থেকে বাংলাদেশকে নিয়েও কিছু বার্তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ভর্তুকি এড়িয়ে চলা, ব্যাংকবহির্ভূত লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ কতটা অগ্রগতি অর্জন করছে, তা পর্যালোচনা করবে আইএমএফ। এ লক্ষ্যে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ ও আইএমএফের প্রতিনিধিদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
সভা থেকে জানানো হয়, এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে ঋণ পরিশোধ ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি ও বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ সামলাতে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো। তৃতীয়ত, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা।
বাংলাদেশের অর্থায়নসংক্রান্ত আলোচনায় কোনো প্রস্তাব বা অনুরোধকে অনুমোদিত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক সহায়তার ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণ, সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা, শর্ত এবং অর্থ ছাড়ের পর্যায়—সবকিছু যাচাই করা জরুরি। একইভাবে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি কোন খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে এবং তা কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে।
সম্মেলনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো বড় ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা দেখালেও এই স্থিতিশীলতা ঝুঁকিমুক্ত নয়। যুদ্ধ ও সংঘাত, বাণিজ্যপথে বিঘ্ন, উচ্চ সরকারি ঋণ, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতিতে আইএমএফের প্রধান গুরুত্ব ছিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সরকারি অর্থব্যবস্থার ঝুঁকি কমানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে।
সম্মেলনের সমাপনী পর্যায়ে আয়োজক দেশ থাইল্যান্ডের ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। থাই সরকারের মুখপাত্র একাপপব পিয়ানপিসেস জানান, জর্জিয়েভা সম্মেলন আয়োজনের সাফল্য ও দক্ষতার প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, অংশগ্রহণকারীরা এ আয়োজন থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক কমিটির (আইএমএফসি) চেয়ারম্যান ও সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদানও থাইল্যান্ডের আয়োজনের উচ্চমানের প্রশংসা করেন। দেশটি প্রায় ২০ হাজার অংশগ্রহণকারীকে স্বাগত জানায়।
সম্মেলনে আইএমএফের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ ছিল সরকারি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাওয়া। ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়তে থাকায় উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফের আলোচনায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা, জ্বালানি ও খাদ্যের সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং আর্থিক নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে। বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আরও বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। তাই সাময়িক সংকট মোকাবিলায় নেওয়া সরকারি সহায়তা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে দীর্ঘ মেয়াদে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি না হয়।
বিশেষ করে জ্বালানি ভর্তুকি নিয়ে আলোচনায় লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, জ্বালানি ভর্তুকিতে বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। তবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিয়ে কীভাবে ভর্তুকি সংস্কার করা যায়, সেটিও নীতিনির্ধারকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। আইএমএফের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকিও উঠে এসেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক কাজ দ্রুত ও কম খরচে সম্পন্ন করতে পারলেও কিছু প্রচলিত চাকরির চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের প্রবেশপর্যায়ের চাকরি এবং নিয়মিত কাজনির্ভর পেশাগুলো পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। এ কারণে দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত নীতিমালা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে এআই ব্যবহারের ফলে সাইবার হামলা, ডিজিটাল জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় এসেছে। ব্যাংক অব থাইল্যান্ড, আইএমএফসহ সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের আলোচনায় ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় ‘ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্ট’ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সমাপনী অধিবেশনের বক্তব্যে উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন মডেল এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর হিসাবে, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে ১২০ কোটি তরুণ। অথচ এ সময়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে প্রায় ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অজয় বাঙ্গা বলেন, চাকরি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি মানুষের মর্যাদা। উন্নয়নের জন্য সরকারি অর্থ, বেসরকারি পুঁজি, দাতব্য সহায়তা ও প্রযুক্তিকে দেশগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী একত্রে কাজে লাগাতে হবে। যেখানে বাজার এখনো পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে সরকারি ও স্বল্পসুদে অর্থায়ন প্রয়োজন। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার পরিসর বাড়ানো সম্ভব হলে সেই পুঁজিকে কাজে লাগাতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ অর্থবছরে তাদের উদ্যোগে বেসরকারি খাত থেকে উন্নয়ন অর্থায়ন সংগ্রহ হয়েছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে তা বেড়ে ১১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নসহ বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মোট অর্থায়ন ২৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশ্বব্যাংক অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ পেয়েছে।
একই সময়সীমার মধ্যে এক বিলিয়ন মানুষের পানির নিরাপত্তা উন্নয়ন, ৩০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষককে উৎপাদন বাড়িয়ে উদ্বৃত্ত তৈরি করতে সহায়তা এবং ১৫০ কোটি মানুষের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়ন এবং বাজার সংযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। ডিজিটাল তথ্যের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম দৃশ্যমান করা, বড় ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সংঘাতপ্রবণ ও দুর্বল অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এবারের সম্মেলনের প্রধান অর্জন ছিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং উন্নয়ন অর্থায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনা। আইএমএফের আলোচনায় ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, ভর্তুকি ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত ঝুঁকি মোকাবিলা গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং বেসরকারি পুঁজি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেছে।
সম্মেলনে ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় ব্যাংকক ব্লুপ্রিন্টের মতো সহযোগিতামূলক উদ্যোগও সামনে এসেছে। পাশাপাশি, উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য ছয়টি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মধ্যে বিনিয়োগ মূল্যায়ন ও হস্তান্তরের অভিন্ন পদ্ধতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন অজয় বাঙ্গা।
তবে এসব উদ্যোগের ঘোষণাকে তাৎক্ষণিকভাবে সব দেশের জন্য নতুন অর্থায়ন বা ঋণ অনুমোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সম্মেলনের আলোচনায় নীতিগত দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র স্পষ্ট হলেও বাস্তব ফল নির্ভর করবে দেশভিত্তিক সংস্কার, বিনিয়োগ বাস্তবায়ন এবং প্রতিশ্রুত অর্থায়ন কার্যকরভাবে পৌঁছানোর ওপর।
