• বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:৩৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম

নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে বিশ্ব, নতুন সংঘাত কি আসন্ন?

রির্পোটার / ১০ পাঠক
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে বিশ্ব, নতুন সংঘাত কি আসন্ন?

বিশ্বব্যাপী সামরিক অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে যে অল্প কয়েকটি কার্যকর আন্তর্জাতিক চুক্তি এখনো টিকে ছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল নিউ স্টার্ট চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটির মেয়াদ আজ ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্ব প্রবেশ করল এমন এক যুগে, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর কোনো কার্যকর আইনি নিয়ন্ত্রণ আর রইল না।

নিউ স্টার্ট (Strategic Arms Reduction Treaty) ছিল বিশ্বের দুই বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বশেষ কার্যকর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—দুই দেশই কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়াই তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার সম্প্রসারণের সুযোগ পাচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি ‘ভয়াবহ মুহূর্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

চুক্তির উত্থান ও ভাঙন

২০১০ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ নিউ স্টার্ট চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ২০১১ সালে এটি কার্যকর হয়। পরে ২০২১ সালে জো বাইডেন প্রশাসন চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করে।

তবে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালে রাশিয়া চুক্তিতে তাদের অংশগ্রহণ ‘স্থগিত’ করার ঘোষণা দেয়। যদিও মস্কো দাবি করেছিল, তারা চুক্তিতে নির্ধারিত অস্ত্রসীমা লঙ্ঘন করেনি। বাস্তবে কোভিড-১৯ মহামারি ও পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ—পারস্পরিক পরিদর্শন ও তথ্য বিনিময়—গত কয়েক বছর ধরেই কার্যত বন্ধ ছিল।

কী ছিল নিউ স্টার্ট চুক্তিতে

এই চুক্তির আওতায় দুই দেশ তাদের মোতায়েন করা কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা সর্বোচ্চ ১,৫৫০টিতে সীমিত রাখার অঙ্গীকার করেছিল। পাশাপাশি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ভারী বোমারু বিমানের সংখ্যা ৭০০টির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার শর্ত ছিল। মোতায়েন ও অ-মোতায়েন মিলিয়ে মোট লঞ্চারের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮০০টি নির্ধারণ করা হয়।

তবে চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্বচ্ছতা। এর মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের পারমাণবিক ঘাঁটি বছরে ১৮ বার পর্যন্ত পরিদর্শনের সুযোগ পেত এবং প্রতি ছয় মাসে ক্ষেপণাস্ত্র ও ওয়ারহেডের সংখ্যা ও অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করত। এই ব্যবস্থাই দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্বের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বে বিদ্যমান মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের প্রায় ৯০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দখলে। সেন্টার ফর আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড নন-প্রোলিফারেশন (CSACNP) অনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়ার কাছে রয়েছে প্রায় ৫,৪৫৯টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ৫,৫৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড। শীতল যুদ্ধের সময় একসময় যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ৩১ হাজারের বেশি পারমাণবিক অস্ত্র ছিল। নিউ স্টার্ট চুক্তিই মূলত এই দুই পরাশক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।

বর্তমান বাস্তবতা ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাশিয়া এক বছরের জন্য অনানুষ্ঠানিক সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে জানায় ক্রেমলিন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এতে আগ্রহ দেখায়নি। ওয়াশিংটনের যুক্তি, চীনের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতাকে অন্তর্ভুক্ত না করে শুধু রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অন্যদিকে চীন এখনো কোনো ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় যোগ দিতে সম্মত হয়নি। ফলে নতুন কোনো বিকল্প চুক্তির সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ভবিষ্যৎ কোন পথে

নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার অর্থ হলো—দুই দেশের পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের ওপর থাকা শেষ আইনি সীমাবদ্ধতাও বিলুপ্ত হলো। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর ফলে নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।

আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিমবল সতর্ক করে বলেছেন, শিগগির কোনো সমঝোতায় না পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই তাদের ক্ষেপণাস্ত্রে আরও বেশি ওয়ারহেড সংযোজন শুরু করতে পারে। রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভও বলেছেন, ‘নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক অস্ত্রের এক নতুন বিশ্বের জন্য রাশিয়া প্রস্তুত।’

এই বাস্তবতায় বিশ্লেষকদের অভিমত, নিউ স্টার্ট চুক্তির অবসান শুধু একটি চুক্তির শেষ নয়—এটি পাঁচ দশকের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি যুগান্তকারী ভাঙন। এর ফলাফল কী হবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনে পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর। তবে আপাতত বিশ্ব যে আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সময়ের দিকে এগোচ্ছে, তা নিয়ে খুব কমই সন্দেহ রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরোও