বর্ষা মানেই চারদিকে থইথই পানি আর জলাবদ্ধতা। এই আর্দ্র আবহাওয়া ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে নানা ধরনের সংক্রামক রোগের প্রকোপ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। এ সময়ে পেটের পীড়া বা সাধারণ জ্বর হলেও অনেকেই হয়তো জানেন না, এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভারের ওপর। অসচেতনতার কারণে বর্ষায় অনেকেই লিভারের নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হন।
সম্প্রতি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভির নিয়মিত আয়োজন 'স্বাস্থ্য প্রতিদিন' অনুষ্ঠানের একটি পর্বে লিভারের পানিবাহিত রোগ ও এর বিস্তার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন দেশের প্রথিতযশা লিভার রোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ কে এম শামসুল কবীর।
লিভারের যেসব রোগ হতে পারে
অধ্যাপক ডা. শামসুল কবীরের মতে, বর্ষাকালে পানিবাহিত রোগের কারণে লিভার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশ বেশি থাকে। এর মধ্যে প্রধান ও সাধারণ রোগগুলো হলো ভাইরাল হেপাটাইটিস বা জন্ডিস। বিশেষ করে বর্ষাকালে হেপাটাইটিস 'এ' এবং 'ই' ভাইরাসের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
এ ছাড়া ব্যাকটেরিয়াজনিত এন্টারিক ফিভার বা টাইফয়েড এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে লিভারে পুঁজ জমার (লিভার অ্যাবসেস) মতো গুরুতর সমস্যাও হতে পারে, যার প্রধান বাহক দূষিত পানি। এমনকি ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ মশার মাধ্যমে ছড়ালেও, এসব রোগের কারণেও রোগীর লিভারের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
যেভাবে ছড়ায় সংক্রমণ
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, পানির মাধ্যমে এই ক্ষতিকর ভাইরাস কীভাবে মানবদেহে প্রবেশ করে? চিকিৎসকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হেপাটাইটিস 'এ' বা 'ই' আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির মলের মাধ্যমে ভাইরাসটি পরিবেশে ছড়ায় এবং কোনোভাবে পানির উৎসের সাথে মিশে যায়।
আমাদের দেশের অনেক এলাকায় ওয়াসার সাপ্লাই লাইন ও ময়লার স্যুয়ারেজ লাইন পাশাপাশি থাকে। অনেক সময় পাইপলাইন ত্রুটিপূর্ণ থাকায় বা ফেটে যাওয়ায় দূষিত স্যুয়ারেজের পানি বিশুদ্ধ পানির লাইনে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ডা. শামসুল কবীর সতর্ক করে বলেন, শুধু পানি ফুটিয়ে খেলেই এই ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা যায় না। কারণ, সেই দূষিত পানি দিয়ে থালা-বাসন ধোয়া, কাঁচা শাকসবজি ও সালাদ পরিষ্কার করা কিংবা রাস্তাঘাটের খোলা শরবত পানের মাধ্যমেও এই ভাইরাস খুব সহজে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
সুরক্ষিত থাকার উপায়
চিকিৎসকের মতে, জীবাণুযুক্ত পানি সামান্য পরিমাণেও শরীরে প্রবেশ করলে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে যে কারও হেপাটাইটিস হতে পারে। তাই এই বর্ষায় সুস্থ থাকতে তিনি কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:
নিরাপদ পানির ব্যবহার: পানি কেবল ফুটিয়ে খাওয়ার পাশাপাশি রান্নার কাজে বা থালা-বাসন ধোয়ার ক্ষেত্রেও নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হবে।
বাইরের খাবার পরিহার: রাস্তাঘাটে তৈরি খোলা শরবত, কেটে রাখা ফল বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সালাদ খাওয়া থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে।
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা: খাবার গ্রহণ ও তৈরির আগে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে।
লিভারের মতো সংবেদনশীল অঙ্গকে সুরক্ষিত রাখতে এই বর্ষা মৌসুমে সামান্য সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই হতে পারে আপনার ও আপনার পরিবারের সুস্থতার চাবিকাঠি।