বন্ধ হওয়ার দীর্ঘ ছয় বছর পর অবশেষে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালু হতে যাচ্ছে খুলনার ঐতিহ্যবাহী প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ও স্টার জুট মিল। মিল দুটি চালুর পর সেখানে অন্তত ৬ হাজার ৩৯১ জন মানুষের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিস্তব্ধ থাকা খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে আবারও ফিরবে কর্মচাঞ্চল্য।
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সরকারি এক সিদ্ধান্তে প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলটি হ্যামকো গ্রুপকে এবং স্টার জুট মিলটি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কাছে ইজারা (লিজ) দেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা
বিজেএমসির তথ্য অনুযায়ী, প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে প্রায় ২১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে হ্যামকো গ্রুপ। এতে অন্তত ১ হাজার ১৫৩ জনের কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এই মিল থেকে বার্ষিক প্রায় ১৭৫ কোটি টাকার পণ্য বিক্রির (টার্নওভার) লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে, স্টার জুট মিলে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ৫ হাজার ২৩৮ জনের। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক সম্ভাব্য বিক্রয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
কী উৎপাদন হবে
লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রচলিত পাটপণ্যের পাশাপাশি আধুনিক ও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
হ্যামকো গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন) মো. মাইনুদ্দীন সানা বলেন, ‘চুক্তির প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বিজেএমসির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য তিন মাস সময় পাওয়া যাবে। সবকিছু গুছিয়ে মিলটি চালু করতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।’ তিনি আরও জানান, মিলটিতে সামান্য কিছু আধুনিক পাটজাত পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি উন্নত মানের লিথিয়াম ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে স্টার জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ জানান, মিলের মোট ৫৬ একর জমির মধ্যে ৪৬ একর জমি ও এর অবকাঠামো তারা ইজারা নিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে সেখানে ব্যাগ, জুতা, মশারি ও ছাতাসহ নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন করা হবে। ভবিষ্যতে এই চত্বরে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র (পাওয়ার প্ল্যান্ট) নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। মিলটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে ৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নেপথ্যের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
১৯৫৪ সালে খুলনা মহানগরের খালিশপুরে ভৈরব নদের তীরে ৫০ একর জমির ওপর প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল এবং নদের অপর পার দিঘলিয়া উপজেলায় ৫৬ একর জমির ওপর স্টার জুট মিল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
ক্রমাগত লোকসানের কারণে ২০২০ সালের ২৫ জুন মিল দুটিসহ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন সরকার। এরপর ওই বছরের ২ জুলাই শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় অবসর দিয়ে মিল দুটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েন হাজার হাজার শ্রমিক।
বন্ধ হওয়ার সময় প্লাটিনাম জুট মিলে ৯৫৭টি এবং স্টার জুট মিলে ৭৭০টি তাঁত সচল ছিল। তবে দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকায় এসব তাঁতের বেশির ভাগই এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে কারখানা দুটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্লাটিনাম জুট মিলে ১২০ জন এবং স্টার জুট মিলে ১০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন।
উদ্বেগ ও শঙ্কা
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারি খাতে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় নাগরিক আন্দোলনের নেতারা।
‘পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ’ খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ১৯৯৩ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে দেশে ৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বেসরকারি খাতে দেওয়া হয়েছিল, যার বেশির ভাগই পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক ব্যবসায়ী এসব কারখানা দেখিয়ে ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা খেলাপি করেছেন। এবারও তেমন কোনো পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, তার সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি কোথায়?’
তিনি মনে করেন, সরকারের উচিত ছিল লোকসানের নেপথ্যের প্রকৃত কারণগুলো চিহ্নিত করে সরকারি উদ্যোগেই আধুনিকায়নের মাধ্যমে মিল দুটি সচল করা।