শুক্রবার , ০২ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়

আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে এলপিজির দাম প্রায় দ্বিগুণ

Writer
বাংলা পত্রিকা ডেস্ক
01 Oct, 2026 09:07 PM 4 বার পঠিত 1 মিনিট পড়ার সময়

ছবি: সংগৃহীত

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও খুচরা বাজারে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা, অথচ কোথাও কোথাও তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত।

আমদানিতে ঘাটতি না থাকলেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। আবার সিলিন্ডার নেই—এ অজুহাতে অনেক জায়গায় দোকান বন্ধ রেখেছেন এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রেতারা।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ও খাতসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—দুই মাসেই দেশে এলপিজির আমদানি পর্যাপ্ত ছিল। ফলে আমদানির ঘাটতির কারণে বাজারে সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিইআরসি বলছে, দেশে সেপ্টেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। আগস্ট মাসে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। সেই হিসাবে দেশে চাহিদার তুলনায় এলপিজির সংকট থাকার কথা নয়। প্রতি মাসের ২ তারিখে এলপিজির নতুন মূল্য ঘোষণা করে বিইআরসি। সেই ঘোষণাকে সামনে রেখে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাজার কারসাজি করছেন বলে ধারণা করছেন বিইআরসি কর্মকর্তারা।

সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, এমনিতেই বাসাবাড়িতে নিয়মিত গ্যাস পাওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে রান্নার কাজে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে সিলিন্ডার কিনতে হওয়ায় সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

রাজধানীর কলাবাগানের মো. আমিনুর বলেন, "এমনিতেই বাসায় গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে সিলিন্ডারের গ্যাসে রান্না করতে হয়। এখন সিলিন্ডারের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সংসারের খরচ চালানোই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।"

তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের দামও বেশি। এর মধ্যে রান্নার গ্যাসের দাম এভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

আজিমপুরের বাসিন্দা সোনিয়া পারভীন বলেন, "১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় এলপিজি সিলিন্ডার কিনতাম। এখন ২ হাজার ৮০০, ২ হাজার ৯০০ টাকা ছাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। দোকানে গেলে বলছে নেই। আবার বেশি দাম দিলে পাওয়া যাচ্ছে। এত টাকায় গ্যাস কিনতে গেলে গরিব মানুষের তো সমস্যা হয়। সরকার কি কিছু বোঝে না!"

এলপিজি সিলিন্ডারের ক্রেতা হিসেবে হাতিরপুলের খুচরা বিক্রেতা রিমনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এলপিজি সিলিন্ডার লাগবে বলতেই প্রথম পরিচয় জিজ্ঞেস করেন। এরপর বাটা সিগন্যালের পাশে বাসা এবং মাঝেমধ্যে এলপিজি নিই বললে এই বিক্রেতা একদাম ২ হাজার ৯০০ টাকা চান। বলেন, ১২ কেজির সিলিন্ডার আছে, দাম ২ হাজার ৯০০ টাকা।

দাম এত বেশি কেন—জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, "আমাদের বেশি দামে কিনতে হয়। সিলিন্ডার পাওয়াই যাচ্ছে না এখন। ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে আমরাই কিনি। ১০০ টাকা লাভ না করলে বিক্রি করে কী হবে!"

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধানমন্ডির এক খুচরা ব্যবসায়ী বলেন, "মূল কারসাজি করছেন ডিলাররা। তারা আমাদের থেকে বেশি দাম নেন। আমরা তাহলে সরকারি রেটে কীভাবে মাল (সিলিন্ডার) দেব? বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। এখন তো সিলিন্ডার পাচ্ছি না। দোকান বন্ধ করে রাখছি। দোকান বন্ধ রেখেও কর্মচারীদের বেতন দিতে হচ্ছে। আমরা লসে আছি।"

বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, "এলপিজি আমদানি কমেনি। খুচরা বিক্রেতারা এই সমস্যাটা করছেন। গতকাল সরকার অলরেডি জেলা প্রশাসকদের বলেছে ব্যবস্থা নিতে। সরকার যদি তিনদিন অভিযান চালায়, তাহলে পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে।"

লোয়াব সভাপতি আরও বলেন, কোনো অপারেটর যদি বেশি দামে বিক্রি করে এবং তার প্রমাণ থাকে, তাহলে সেই অপারেটরের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, "গতকাল ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক মাসে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। আগস্ট মাসে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর—এই দুই মাসেই পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে। মার্কেট শর্ট থাকার কথা না।"

তিনি বলেন, "অক্টোবরের ২ তারিখে এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করা হবে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করতে পারেন, দাম যদি বাড়ে, আমার যে মাল আছে সেগুলো রেখে দিই। যদিও দাম বাড়বে নাকি কমবে, আমরাও জানি না। দাম নির্ভর করে সৌদি সিপি মূল্য, জাহাজ ভাড়া—এগুলোর ওপর। আমি মনে করি, মাসের শেষের এই কয়টা দিন ব্যবসায়ীদের সৎ মানসিকতা থাকা জরুরি, যদিও আমি মনে করি তা আছে। তারপরও সবাই তো একরকম হয় না, কিছু অসৎ থাকে।"

এই কর্মকর্তা বলেন, "একটু ধৈর্য ধরতে হবে, ২ তারিখে কী দাম নির্ধারণ হয়। ভোক্তা পর্যায়ে মনিটর করা হচ্ছে। গত মার্চে বাজার মনিটরিংয়ের জন্য বিইআরসি থেকে একটা কমিটি করেছিলাম। লোয়াবের সঙ্গে বসে কীভাবে ধার্যকৃত দাম কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে এই কমিটি কাজ করবে। সেই কমিটিটা আমরা অ্যাক্টিভ করেছি। জেলা প্রশাসকদেরও বাজার মনিটরিং করতে বলা হয়েছে।"

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, "অতিরিক্ত দামের এই পরিস্থিতিতে বিইআরসি দায় এড়াতে পারে না। বিইআরসির উচিত ছিল যারা আদেশ অমান্য করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে, তাদের অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা। সেটা করেনি বিইআরসি। জনগণের অর্থ লুণ্ঠনে সহায়তা করছে। এসব করে বিইআরসি নিজেকে অযোগ্য-অনুপযুক্ত প্রমাণ করছে।"

ট্যাগ: জাতীয়