বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী, এলআরবি’র প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংগীতে অসামান্য ও অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চলতি বছর তাকে এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, দেশের সংগীতাঙ্গনে আইয়ুব বাচ্চুর অবদান অবিস্মরণীয়। তার সৃষ্টি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই কিংবদন্তি শিল্পী। চলে গেলেও রেখে গেছেন অমর সব গান— সেই তুমি, এক আকাশে তারা, ফেরারি মন, আমি বারো মাস, এখন অনেক রাত, রূপালী গিটার—যেগুলো আজও বাঙালির আবেগ ও ভালোবাসার অংশ।
আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতযাত্রা ছিল সংগ্রাম আর সাফল্যের অনন্য গল্প। ১৯৮৩ সালে মাত্র ৬০০ টাকা পুঁজি নিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর প্রতিভার জোরে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন দেশের ব্যান্ড সংগীতের শীর্ষে। গিটার হাতে নিলে তার সুর যেন সরাসরি ছুঁয়ে যেত শ্রোতার হৃদয়। কনসার্টে হাজারো কণ্ঠ একসঙ্গে মিশে যেত তার গানে। ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু ‘এবি’ নন, ছিলেন ‘বস’।
চট্টগ্রামের এক রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু মাত্র ১৬ বছর বয়সেই সংগীতচর্চা শুরু করেন। আশির দশকের শুরুতে যোগ দেন জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘সোলস’-এ। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সোলসের সঙ্গে থেকে তিনি সুপার সোলস, কলেজের করিডোরে এবং মানুষ মাটির কাছাকাছি—এর মতো জনপ্রিয় অ্যালবামে কাজ করেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম একক অ্যালবাম রক্তগোলাপ।
১৯৯০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজের ব্যান্ড ‘এলআরবি’। ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম হিসেবে মুক্তি পায় এলআরবি ১ ও এলআরবি ২। একই সময়ে প্রকাশিত কষ্ট অ্যালবামটি নব্বই দশকের অন্যতম জনপ্রিয় অ্যালবাম হিসেবে সংগীত ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। নব্বই দশকজুড়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকলেও আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন বিনয়ী, সাধারণ মানুষের কাছাকাছি।
মরণোত্তর একুশে পদক পাওয়ার মাধ্যমে আইয়ুব বাচ্চু এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানগুলোর একটিতে ভূষিত হলেন। এটি শুধু একজন শিল্পীর স্বীকৃতি নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসের প্রতিও রাষ্ট্রীয় সম্মান।
রূপালী গিটার থেমে গেলেও, আইয়ুব বাচ্চুর সুর বেঁচে থাকবে বাংলার মানুষের হৃদয়ে—চিরকাল।