নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ‘স্ল্যাং ওয়ার্ড’ প্রমোট করায় এক কলিগকে ব্লক দিলাম। পরে দেখি তালিকা লম্বা হচ্ছে। যত্রতত্র টিনেজারদের ‘স্ল্যাং’ শুনে লজ্জায় মরি। এভাবে বহুবার মরার পর হুঁশ ফিরল। আরে, স্ল্যাং তো অস্বাস্থ্যকর নয়! কান্নায় শোক মন্দীভূত হয়, বায়ুত্যাগে গ্যাস দূর হয়, ঠিক তেমনি জমে থাকা ক্ষোভের আবেগীয় নির্গমনই তো স্ল্যাং, গালাগালি!
ডিবিসির রাজীব ঘোষকে আটকের পর প্রবাস থেকে এক প্রেজেন্টার পোস্ট দিলেন। দেশ থেকে যার কাউন্টার দিলেন আরেক ফিমেল হোস্ট। মিডিয়ায় স্ল্যাং কত প্রকার, কী কী- কি দারুণভাবেই না বুঝিয়ে দিলেন। বোঝা গেল, শুধু মিডিয়ার ভদ্রপল্লী কেন, কোনো পল্লীতেই ঈশ্বর থাকেন না। তাই ‘গা ঘিনঘিন করা’ গালি দিয়েও রাজপথে অনেকে সুপারহিরো বনে যান, মিডিয়া প্রমোটও করতে থাকে।
২.
‘পরীর জামিন বাতিল’, ‘পরোয়ানা জারি’, ‘আত্মসমর্পণে আদালতে হাজির’, ‘৫০০ টাকা মুচলেকায় জামিন’-এসব ছপিয়ে ক্যামেরায় শুধুই পরীর সুশ্রী মুখ, শরীরী আবেদন।‘ জামিনের পরে আপনার প্রতিক্রিয়া কী’-এই প্রশ্নের ফেস এক্সপ্রেশনযুক্ত উত্তরের প্রত্যাশাটুকুই সাংবাদিকতা? আদালত প্রাঙ্গণে পরীর সংবাদমূল্য আর কী কী- তা নিয়ে ভাবার দরকারও নেই ক্যামেরাগুলোর!
টিভি চ্যানেল বাদে সবচে বেশি ফলোয়ার প্রথম আলোর, ২ কোটি ৩০ লাখ। যুগান্তরের ১ কোটি ১০ লাখ, সমকালের ৭৭ লাখ; আর ব্যক্তিপরীর একাই ১ কোটি ৭০ লাখ। ফলে ভিউবাণিজ্যের দৌড়ে মোজোদের পাত্তা দেবেন কেন পরী? ডজন ডজন ক্যামেরা কেন যে তার দিকে তেড়ে আসে সেই প্রশ্নের উত্তরও তাই অজানা নয়।
৩.
পরী তো পরীই! ছাগল কোলে নেওয়া সেই গ্রাম্য কিশোরীর অক্সফোর্ডে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও যৌন অবদমনে কাতরদের স্যাটিসফ্যাকশন-রানী হয়ে উঠতে পারেন। স্বপ্নের ক্লান্তি কিংবা সরাসরি না পাওয়ার ক্ষোভের গভীর আবেগীয় নির্গমনে তাই ‘খারাপ, নষ্ট, নিকৃষ্ট.. বলে চিৎকার, হুংকার!“ বিয়ন্ড টাচ” ক্যাটাগরির স্টারদের কয়টা স্বামী, কতজন বেড+ডেট পার্টনার তা বার বার হাজির করায় যৌনতার অনুভূতিই মেলে!
এভাবে নিউজওয়ার্কাররা যদি ফিজিক্যাল ওয়ার্কারদের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে গালির প্রতিবাদে অভিযুক্তের বেড-পার্টনার পরিসংখ্যান দিতে থাকেন তখন পরীরা দুই অক্ষরের ‘অশ্রাব্য-নিষিদ্ধ’ প্রতিক্রিয়া থেকে লাল হরফে তীব্র যৌন উত্তেজনাকর শব্দ-বাক্যের ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়েন। ফলে ‘মোরাল জার্নালিজম’ যুদ্ধে পরাজয় মানতেই হয়। যারা গ্রাম্য পরীকে অভিজাত পাড়ায় এনে ‘প্রবল শিকারী- প্রতিবাদি’ বানিয়েছে তাদের গল্পে ‘রিয়াল জার্নালিজম’ নীরবতা পালন করে।
৪.
বলতে কি, মোজো যতটা না জার্নালিজম, তারচে বেশি এখন ক্লিকবেইট বা ভিউ-ড্রাইভেন এক্টিভিজম। ঠিক তেমনি, প্রথম আলো যতটা ‘বস্তুনিষ্ঠতা’ তারচে বেশি ‘তারুণ্যভিত্তিক সামাজিক-রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ’। মিডিয়া তো সবাইকে স্যাটিসফাইড করার টেন্ডারবাজি নয়। কাউকে খুশি করতে পারিনি বলে ‘স্যরি’ বলটাও তাই ‘চটুলতা’!
হাজার হাজার নিউজ মিডিয়ার বন্যাতেও যে পিছিয়ে থাকা যায়, সেটাই বাংলাদেশ। বিনোদন বিট যেমন ইন্ডাস্ট্রির কাজে আসে না, শুধুই পরীদের নিয়ে বিজনেস করে, তেমনি রাজনীতি বিটও অপরাজনীতির কিছু ‘ছিঁড়তে’ পারেনি সাড়ে পাঁচ দশকেও। প্রেসক্লাব, ইউনিয়ন, ফোরাম, ইউনিটি হয়ে উঠেছে দালালবাজির এক একটা শিল্পপল্লী। ফলে ‘স্যরি’ তো তাদেরই বলার কথা।
বড় মিডিয়ার সম্পাদকেরা একেকজন ব্রিটিশ শাসক-কানকথায় পারদর্শী, জাজমেন্টাল, তোষামোদে আসক্ত। তারা নেপোটিজম মানেন, সমতা বোঝেন না। সেকেলে নিউজ ম্যানেজম্যান্ট বোঝেন, সাইকোলজি বেইজড মডার্ন ম্যানেজমেন্ট এক্টিভ করতে অক্ষম। সে দিক থেকে ‘স্যরি’ বলা যায়।
মূলত, ‘গালাগালি’ যেমন সেলফ প্রটেকশন, তেমনি ‘স্যরি’ বলাটাও মহত্বের আড়ালে এক ধরনের প্রটেকশন সিকিং। তাই পরীর ‘গালি’ আর মিডিয়ার ‘স্যরি’ বলার মধ্যে কোথায় যেন গভীর মিল।
(ভাবনা সব এলোমেলো: ৭ নভেম্বর, ২০২৬। এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা)
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সংবাদ
