কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে কেবল পুলিশি অভিযান কিংবা আইনি গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়; এর জন্য মূল হোতাদের শনাক্তকরণ, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বৃদ্ধি, স্মার্টফোনের সচেতন ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ওপর জোর দিচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগর এলাকাতেই ১৫৯টি এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে। অপরাধের এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক দূরত্ব, শিক্ষাজীবনে অনিয়ম, অবসর সময় ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগের অভাব এবং স্থানীয় অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের অপব্যবহারের কারণে অনেক কিশোর অপরাধের অন্ধকার জগতে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে অপরাধ সংঘটনের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই তাদের চিহ্নিত করে সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বাসসকে বলেন, “যৌথ পরিবারের অবক্ষয়, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব, পারিবারিক কলহ এবং স্কুলে অনিয়মিত উপস্থিতি বা ঝরে পড়ার কারণে কিশোররা বিপথগামী হচ্ছে। বয়সে কম হওয়ায় এবং সামাজিক চাপ কম থাকায় অপরাধীরা অনেক সময় কিশোরদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করে।”
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, “সন্তান কার সঙ্গে মিশছে এবং অনলাইনে কী দেখছে সেদিকে অভিভাবকদের কড়া নজর রাখতে হবে। অন্তত এইচএসসি পর্যন্ত বয়সের কিশোর-কিশোরীদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত।”
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, হালনাগাদ তালিকা ধরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পাশাপাশি তাদের নেপথ্যের মদদদাতা, আশ্রয়দাতা এবং মাদক ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, রাজধানীতে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের ১ হাজার ২১৯ জন সদস্যের তালিকা ধরে এসআরইউ ও ডিবি পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে।
পুলিশের এডিশনাল আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. সায়েদুর রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কিশোর গ্যাং কিংবা তাদের পেছনে থাকা কোনো আশ্রয়দাতাকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মূল লক্ষ্য শুধু গ্রেপ্তার নয়, বরং বিপথগামী কিশোরদের সংশোধন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, বিট পুলিশিং জোরদার এবং সমাজ ও পরিবারের সমন্বিত উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে কিশোর অপরাধ নির্মূল করতে পারে।
