বাদামী রঙের চুল আর সাদা গড়নের শিশুটিকে প্রথম দেখায় যে কেউ বিদেশি বলে ভুল করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে 'মিঠাই' নামের পেজটির সুবাদে শিশুটিকে অনেকেই চেনেন। নিয়মিত নানা কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পেজটিতে তার মায়ের বিভিন্ন ব্যবসার প্রমোশনাল ভিডিও প্রচার করা হয়। তবে সাম্প্রতিক এক ঘটনার জেরে সামাজিক মাধ্যমে 'পপুলার নাও' ক্যাটাগরিতে থাকা এই শিশুটিকে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক; এক দম্পতি শিশুটিকে নিজেদের সন্তান বলে দাবি করায় তৈরি হয়েছে আইনি জটিলতা।
দাবির পেছনের প্রেক্ষাপট ও নিখোঁজের অভিযোগ
সম্প্রতি বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের বিভিন্ন ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। গত ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশন’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা ‘আমার সন্তান কোথায়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে। সেখানে উপস্থিত কামরাঙ্গীরচরের একটি নিখোঁজ শিশুর পরিবার দাবি করে, তাদের সন্তান বাসার সামনে থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর টিকটকে 'মিঠাই' পেজে তাকে দেখা যায়।
পরিবারের অভিযোগ, বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে শিশুটিকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে এক নারী ডিএনএ টেস্টের দাবি জানান এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ আনেন।
পুলিশের বক্তব্য ও বর্তমান পরিবারের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম জানান, তাদের থানায় ওই নামের কোনো নিখোঁজ শিশু বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেই। খিলগাঁও থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে বলতে হবে।
এদিকে 'মিঠাই' পেজে একটি ভিডিও প্রকাশ করে শিশুটির মা এই অভিযোগ তীব্রভাবে অস্বীকার করেছেন। প্রায় দেড় বছর ধরে ওই নারী তাদের হয়রানি করছেন উল্লেখ করে তিনি জানান, ২০২১ সালের জুলাইয়ে শিশুটির জন্মের পর ওই বছরের অক্টোবরে পেজটি খোলা হয়। অন্যদিকে কামরাঙ্গীরচরের শিশুটি ২০২৪ সালের মার্চে নিখোঁজ হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, নিখোঁজের আগের দিনগুলোতেও তার সন্তানের ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল। সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ ওই পরিবার দেখাতে পারেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশে ডিএনএ টেস্টের প্রক্রিয়া ও নিয়ম
শিশুটির পরিচয় নিয়ে বিতর্কের জেরে ডিএনএ টেস্টের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড হলো প্রতিটি জীবের জেনেটিক কোড। সাধারণত গালের কোষের সোয়াব নমুনার মাধ্যমে এই পরীক্ষা করা হয়।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির সায়েন্টিফিক অফিসার আবু সুফিয়ান জানান, টেস্ট মূলত দুই প্রকার—ফরেনসিক এবং ডায়াগনস্টিক। পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নিরূপণ কিংবা অপরাধ তদন্তের জন্য কেবল ফরেনসিক ডিএনএ টেস্ট করা হয়।
বাংলাদেশে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব যাচাইয়ের জন্য কেবল দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই টেস্ট করা যায়:
-
সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ)
-
ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি (মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে)
কর্মকর্তারা জানান, ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিংবা শখের বশে কেউ চাইলেই এই ল্যাবগুলোতে ডিএনএ টেস্ট করাতে পারেন না। শুধুমাত্র আদালত বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ, ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত দূতাবাসের নির্দেশ কিংবা কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের মতো জরুরি ক্ষেত্রে এই ল্যাবগুলোতে পরীক্ষা করা হয়। সিআইডির স্পেশাল সুপারিনটেন্ডেন্ট অব পুলিশ (এসএসপি) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব জানতে হলে প্রথমে থানায় জিডি বা মামলা করতে হবে অথবা সরাসরি আদালতে গিয়ে আবেদন করতে হবে। আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশ পাওয়া গেলেই কেবল ল্যাবগুলো এই টেস্ট সম্পন্ন করে থাকে।
