দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ঘোষিত ২০টি বিশেষ উদ্যোগের মধ্যে ইতোমধ্যে সাতটির বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে।
বাস্তবায়িত প্রধান উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কাস্টমস ও ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু, সমন্বিত বিনিয়োগসেবা এবং নতুন এফডিআই প্রণোদনা কর্মসূচি।
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ও খাত থেকে সম্ভাব্য ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের (১.৩ বিলিয়ন ডলার) একটি বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কিংবা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।
গত বছরের ১৬ মার্চ 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ' এই ২০টি সমন্বিত উদ্যোগের ঘোষণা দেয়। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজীকরণ এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথ সুগম করাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।
এ বিষয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, "বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের যে লক্ষ্য, এই পরিকল্পনা তারই অংশ। আমরা অবকাঠামো, সেবার মান এবং সম্ভাবনাময় বিনিয়োগের পাইপলাইন তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছি। কিছু পরিবর্তন ইতিমধ্যে এসেছে। তবে বড় প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়নে আরও সময় লাগবে।"
ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রোচি বাসসকে জানান, উদ্যোগগুলোকে তিনটি মূল স্তম্ভের অধীনে ভাগ করা হয়েছে—শক্তিশালী অবকাঠামো, বিনিয়োগে সহায়তা এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন।
অবকাঠামো খাতের অগ্রযাত্রা
বাস্তবায়িত অবকাঠামোগত উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। এপিএম টার্মিনালস ২০৩০ সালের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। টার্মিনালটি চালু হলে ৭০০ জনের বেশি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়বে।
পাশাপাশি চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) বাস্তবায়নে শুরু হয়েছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ। ২০২৮ সালের মধ্যে সম্পন্ন হতে যাওয়া এই শিল্পাঞ্চলে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে পাইপলাইন বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৩০ কোটি ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি ডলার ইতিমধ্যেই সক্রিয়।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কাস্টমস ছাড়পত্র ও ব্যাংকিং সেবা চালু হওয়ায় পণ্য খালাসের সময় কমে আসার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বিলম্বজনিত লোকসান কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এক ছাতার নিচে বিনিয়োগসেবা
বিনিয়োগকারীদের হয়রানি কমাতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমকে একীভূত করে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ'-এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বিনিয়োগ আকর্ষণে আরেকটি বড় অগ্রগতি হলো বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সম্পাদন। এর আওতায় বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য (৮,৪২৮টি পণ্য) কোরিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।
এদিকে বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী ও ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের সংলাপে উত্থাপিত ২৮টি সমস্যার মধ্যে ২১টির সমাধান করা হয়েছে, যা মোট সমস্যার প্রায় ৭৫ শতাংশ।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এফডিআই প্রণোদনা কর্মসূচি। নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিদেশি মূলধন বা ইক্যুইটি আনতে সক্ষম যোগ্য ব্যক্তি ১.২৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাবেন। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে এই সেবা চালুর লক্ষ্য নিয়ে একটি পৃথক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ চলছে।
বাকি ১৩ উদ্যোগের অগ্রগতি
বাকি ১৩টি উদ্যোগের কাজও বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান। এর মধ্যে রয়েছে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, প্রথম পিপিপি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ), বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্মের সম্প্রসারণ এবং চীনের গুয়াংজুতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয় স্থাপন।
বৃহস্পতিবার এনসিটি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশ্বখ্যাত লজিস্টিকস অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে একটি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ২ লাখ টন থেকে বেড়ে ৫ লাখ টনে (১৫০% বৃদ্ধি) উন্নীত হবে এবং ৬ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বিনিয়োগের পাইপলাইন ও নতুন প্যাকেজ
ইনভেস্ট বাংলাদেশের ১৩০ কোটি ডলারের বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ পাইপলাইনের মধ্যে চীন থেকে ৬০ কোটি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০ কোটি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ কোটি এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০ কোটি ডলার আসার সম্ভাবনা রয়েছে। খাতভিত্তিক হিসাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ৩০ কোটি ডলার করে এবং স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতে ২০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগ প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিনিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে ‘বাংলাবিজ’-এর আওতায় ৩ দিনের ‘বিজনেস স্টার্টার প্যাকেজ’ এবং ১৪ দিনের ‘বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ’ চালু করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৫টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা ১০ হাজার একরের বেশি শিল্প জমিতে ৪৪টি সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে পোর্টফোলিও তৈরির কাজ চলছে।
