পেশাগত কিংবা ব্যক্তিগত জীবন—প্রতিদিনই আমাদের নিতে হয় নানা ধরনের ছোট-বড় সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটা জীবনেরই স্বাভাবিক একটি অংশ। তবে একই সঙ্গে কিংবা টানা অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে কি মানসিক ক্লান্তি বোধ করছেন? আপনার মস্তিষ্কও কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে নিতে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রমাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে সৃষ্ট এই মানসিক অবসাদের নাম ‘ডিসিশন ফ্যাটিগ’ বা ‘সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি’।
জার্নাল অব হেলথ সাইকোলজিতে প্রকাশিত ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন হাজার হাজার সিদ্ধান্ত নেন। ভারী ব্যায়ামের পর যেমন শরীরের পেশী ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তেমনই একটানা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মস্তিষ্কের কাজ করার স্বাভাবিক ক্ষমতাও কমে যায়।
বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব দেখা যায়। গবেষকরা জানান, একটানা রোগীদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে চিকিৎসকরা অনেক সময় সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তিতে ভোগেন। এর ফলে তাঁদের চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি ভুল করার প্রবণতাও দেখা যায়। এমনকি দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীরাও প্রতিদিনের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চাপের কারণে নিজেদের সঠিক যত্ন নেওয়ার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেন।
ডিসিশন ফ্যাটিগের ৭টি লক্ষণ : ১. সাধারণ ও ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নিতেও হিমশিম খাওয়া।
২. যেকোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অস্বাভাবিক বেশি সময় লাগা।
৩. সিদ্ধান্ত নেওয়া পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা।
৪. মেজাজ খিটখিটে বা অধৈর্য হয়ে পড়া।
৫. বারবার নিজের গৃহীত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা।
৬. সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ কমাতে না ভেবেই সবচেয়ে সহজ বা শর্টকাট বিকল্পটি বেছে নেওয়া।
৭. একাধিক সিদ্ধান্তের পর প্রচণ্ড মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি বোধ করা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সারাদিনের ব্যস্ত কর্মদিবস, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অতিরিক্ত বিকল্প থাকা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং ফোন ও ইমেইলের নোটিফিকেশনের চাপে এই সমস্যা দ্রুত রূপ নেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে; বরং অতিরিক্ত ব্যবহারে সাময়িকভাবে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে ওঠে।
যেভাবে কাটিয়ে উঠবেন এই ক্লান্তি :
-
দিনের যে সময়ে আপনি সবচেয়ে বেশি সজাগ ও ফ্রেশ থাকেন, তখনই সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করুন।
-
খাবার, জামাকাপড় বা দৈনন্দিন ছোটখাটো কাজের জন্য নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করে নিন, যাতে অনর্থক ভাবতে না হয়।
-
একটি ছোট দৈনিক করণীয় তালিকা (টু-ডু লিস্ট) রাখুন এবং অপ্রয়োজনীয় কাজের চাপ কমান।
-
কাজের মাঝে মাঝে সংক্ষিপ্ত বিরতি নিন এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
-
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিখুঁত (পারফেক্ট) করার মানসিকতা ছেড়ে তা 'যথেষ্ট ভালো' হলেই মেনে নিন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যদি এই ধরনের মানসিক ক্লান্তি বা মনোযোগের অভাব দীর্ঘদিন ধরে কাজের জায়গা কিংবা ব্যক্তিজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে দ্রুত কোনো স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা কিংবা ঘুমের অনিয়ম থেকেও এ ধরনের সমস্যা হতে পারে।
