ব্যাংকের মূল ব্যবসা ঋণ বিতরণ ও সুদ আয়। কিন্তু সেই ব্যবসাতেই এখন লোকসান গুনছে অনেক ব্যাংক। খেলাপি ঋণের ঝুঁকি, ঋণের চাহিদায় মন্দা এবং সুদ ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে ব্যাংকগুলোর আয়। বিপরীতে সরকারি ট্রেজারি বন্ডসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে আয় করে মুনাফা ধরে রাখছে কিছু ব্যাংক। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে বৈপরীত্য: বিনিয়োগ থেকে আয় হলেও ঋণ ব্যবসায় লোকসান।
চলতি ২০২৬ হিসাব বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১টি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। এ সময়ে নয়টি ব্যাংকের সম্মিলিত লোকসান হয়েছে ৫ হাজার ১২৬ কোটি টাকা। বিপরীতে মুনাফা করা ২২টি ব্যাংকের সম্মিলিত মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৭০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মুনাফা করা ব্যাংকগুলোর আয় লোকসানি ব্যাংকগুলোর ক্ষতি সামাল দিতে পারেনি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোর তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে। দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটির লেনদেন একীভূতকরণ ও বিশেষ নিরীক্ষা প্রক্রিয়ার কারণে স্থগিত রয়েছে। বাকি ৩১টি ব্যাংক তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ১৬টির মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে, ছয়টির কমেছে এবং নয়টি লোকসান করেছে।
ঋণ ব্যবসায় লোকসান, বিনিয়োগে আয়
ব্যাংকগুলোর আয়ের কাঠামোতে বিনিয়োগের গুরুত্ব বাড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে তৃতীয় প্রান্তিকের ফলাফলে। সবচেয়ে বেশি মুনাফা করা পূবালী ব্যাংক জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ৯০০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মুনাফা বেড়েছে ১৭০ শতাংশ। তবে একই সময়ে ব্যাংকটির মূল ঋণ ব্যবসায় লোকসান হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ ঋণ বিতরণ থেকে আয় না করেও সরকারি ট্রেজারি বন্ডে ১১.৫% থেকে ১২.৫% নিশ্চিত কুপন আয় ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে ব্যাংকটি।
এ সময়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। আগের বছরের একই প্রান্তিকে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৬২৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা (প্রবৃদ্ধি ১০.৭২%, প্রায় ১১ শতাংশ)। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সিটি ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ৩৪১ কোটি টাকা। তবে আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় ব্যাংকটির মুনাফা কমেছে ১৯ শতাংশ।
প্রাইম ব্যাংক ২৫১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ১৮২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। এ ছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ২৩৫ কোটি টাকা। তবে মুনাফা করলেও ব্যাংকটির ঋণ কার্যক্রমে লোকসান হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি লোকসান ইসলামী ব্যাংকের
লোকসানি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকটির নিট লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি ৩২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল। ব্যাংকটির মূল সুদ/বিনিয়োগ আয়কারী কার্যক্রমেই লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা।
এ ছাড়া এবি ব্যাংক ৮৮০ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংক ৮৩৮ কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ৭২৯ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এসব ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমেও বড় অঙ্কের লোকসান হয়েছে। এবি ব্যাংকের ঋণ ব্যবসায় লোকসান ৭৫৫ কোটি টাকা, আইএফআইসির ৭৪৬ কোটি এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের ১ হাজার ৪১ কোটি টাকা।
রূপালী ব্যাংকের লোকসানও আগের বছরের একই প্রান্তিকের ১৬৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৫৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে প্রিমিয়ার ব্যাংকের লোকসান ৫৪১ কোটি টাকা থেকে কমে ১৬৯ কোটি টাকায় নেমেছে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকও আগের বছরের মুনাফার পরিবর্তে এবার ১৫৯ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
ঋণ বিতরণে দুর্বলতা বাড়ছে
ব্যাংকগুলোর আর্থিক ফলাফলে ঋণ ব্যবসার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৬টি ব্যাংক তাদের ঋণ কার্যক্রমে লোকসান করেছে। আটটি ব্যাংকের নিট সুদ আয় কমেছে। বিপরীতে মাত্র তিনটি ব্যাংকের সুদ আয় বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬-এ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। সরকারের নিট ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৪০ শতাংশে।
ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে অনাগ্রহ, উচ্চ ঋণ ব্যয়, জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল রয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় নতুন ঋণ বিতরণেও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ব্যাংকগুলো।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন ও ঋণ বিতরণে তদারকির ঘাটতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনও মুনাফায় প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া কুপন আয় ও মূলধনি মুনাফা ব্যাংকগুলোর জন্য বিকল্প আয়ের ভরসা হয়ে উঠেছে।
সূত্র : বাণিজ্য বার্তা
