ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশে লাখো মানুষের সমাগম হয়েছে। নয়াদিল্লির রামলীলা ময়দানে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে দুপুরের আগেই ১২ একর আয়তনের মাঠটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মাঠের ভেতরে যত মানুষ ছিলেন, বাইরে তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বিক্ষোভকারী অবস্থান নেন। জায়গা না পেয়ে অনেকে কনট প্লেসের আশপাশে ছড়িয়ে পড়েন।
দূষণযুক্ত যানবাহনের দিল্লিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে সমাবেশে লোকসমাগম কম হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল। তবে রোববার দুপুরের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। তখনো ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতাদের বহনকারী খোলা গাড়ি রামলীলা ময়দানে পৌঁছায়নি।
সমাবেশে যাওয়ার মিছিল নিয়ে আগেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। শনিবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ইনস্টাগ্রামে এক বার্তায় জানিয়েছিলেন, কনট প্লেস-মিন্টো রোডের সংযোগস্থল থেকে মিছিল নিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের রামলীলা ময়দানে যাবেন তাঁরা। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল, সমাবেশের অনুমতি চাওয়া হয়েছে এবং তা দেওয়া হয়েছে। তবে মিছিলের জন্য কোনো অনুমতি চাওয়া হয়নি। এ কারণে বিরোধী নেতারা মিছিল করলে পুলিশ কী পদক্ষেপ নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল।
রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে। সিদ্ধান্ত হয়, বিরোধী জোটের নেতারা খোলা গাড়িতে করে রামলীলা ময়দানে যাবেন। এ জন্য কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে একত্র হন বিভিন্ন দলের নেতারা।
দুপুর ১২টার আগেই খোলা গাড়িতে ওঠেন মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, অখিলেশ যাদব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, তেজস্বী যাদব, এম এ বেবি, ফারুক আবদুল্লাহ, মেহবুবা মুফতি, দীপংকর ভট্টাচার্য, কল্পনা সোরেন, সুপ্রিয়া সুলে ও সঞ্জয় রাউতসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা। তাঁদের সঙ্গে অন্য গাড়িতে ছিলেন বিভিন্ন দলের আরও কয়েকজন নেতা। কনট প্লেস-মিন্টো রোডের সংযোগস্থল থেকে নেতাদের গাড়ির পাশাপাশি হাজারো নেতা-কর্মী ও সমর্থকও যাত্রা শুরু করেন।
মাত্র এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে তাঁদের দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। ততক্ষণে রামলীলা ময়দান পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রবেশের জন্য ফটকগুলো বন্ধ করে দেয় দিল্লি পুলিশ। পুরো মাঠে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি জাতীয় পতাকাও উড়তে দেখা যায়।
সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। রামলীলা ময়দানের ভেতরে ও বাইরে চার হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন। আশপাশের এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন আরও ছয় হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য। রোববার ছুটির দিন হওয়ায় কনট প্লেস ও লুটেন্স দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকার সব অফিস বন্ধ ছিল। যানবাহন চলাচলও ছিল সীমিত। ফলে পুরো এলাকায় বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতি চোখে পড়ে।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকে আগেই বিবৃতি দিয়ে রামলীলা ময়দানের এ সমাবেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। শনিবার রাতে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আবারও সমর্থনের কথা জানান।
সিজেপির নেতাদের বক্তব্য, তাঁদের সংগঠন একটি অরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী। সে কারণে কোনো রাজনৈতিক দলের সমাবেশে সরাসরি অংশ নেওয়া তাঁদের জন্য সমীচীন নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অভিজিৎ দিপকে জানান, সিজেপি একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংগঠন হিসেবে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে চায়। তবে ভোট চুরির অভিযোগ এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলনের প্রতি তাঁদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তাঁদের অবস্থান, ভোট চুরির বিরুদ্ধে এবং সিইসির পদত্যাগের দাবিতে যারা আন্দোলন করবে, সিজেপি তাদের পাশে থাকবে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা রোববারের মিছিলে অংশ না নিলেও বহু তরুণ-তরুণীকে তেলাপোকার ছবি সংবলিত পোস্টার হাতে নিয়ে হাঁটতে দেখা যায়।
‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশ আয়োজনের বিরোধিতা করেছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশও। ব্যবসায়ীদের সংগঠন চেম্বার অব ট্রেডার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে রাহুল গান্ধীকে চিঠি দিয়ে কর্মসূচিটি ১০ দিন পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। সংগঠনটির নেতারা রাহুলের সঙ্গে দেখাও করতে চেয়েছিলেন। তবে বিরোধী জোটের নেতারা সেই অনুরোধে সাড়া দেননি।
সমাবেশে যাওয়ার পথে রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, বিজেপি জোর করে আশপাশের দোকানপাট ও বাজার বন্ধ করে দিয়েছে। তাঁর দাবি, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা যাতে কিছু কিনতে না পারেন এবং দোকান বন্ধের দায় বিরোধীদের ওপর চাপানো যায়, সে উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়েছে।
১ নভেম্বরের সমাবেশ ঠেকাতে বিজেপিও বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দলটির পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়, ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নিহত হওয়ার পর দিল্লিতে শিখ নিধন দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল। ওই দিনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে কংগ্রেস নেতাদের শিষ্টাচার দেখানো উচিত বলেও মন্তব্য করে বিজেপি।
এদিকে, রোববার পশ্চিম দিল্লিতে নিহত শিখদের স্মরণে একটি মিছিল বের করে বিজেপি। দলটির নেত্রী ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী ওই মিছিলে নেতৃত্ব দেন।
