ইসলামী সময়চক্রে কিছু রাত আসে, যেগুলো কেবল সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের মধ্যবর্তী একটি সময় নয়—বরং মানুষের আত্মাকে থামিয়ে দেয়, অন্তরকে প্রশ্ন করে, বিবেককে জাগিয়ে তোলে।
শবেবরাত তেমনই এক রজনী।
শাবান মাসের মধ্যরাতে, যখন পৃথিবীর শব্দগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন আকাশের নীরবতার ভেতর মানুষের অন্তর নিজের কাছেই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই রাত ক্ষমার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা হৃদয়গুলোর। কেউ জানে সে ভুল করেছে, কেউ জানে সে পথ হারিয়েছে, আবার কেউ বুঝতে শিখেছে—ফিরে যাওয়ার পথ এখনো বন্ধ হয়নি। ‘বরাত’ মানে মুক্তি, অব্যাহতি, নতুন করে শুরুর অনুমতি।
এই অর্থেই শবেবরাত মানুষকে নিজের অতীতের সামনে দাঁড় করায়—দোষ স্বীকার করার সাহস নিয়ে, সংশোধনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
কুরআনের ভাষায় এটি এক বরকতময় রাত—যে রাতে সতর্কবার্তা নাজিল হয়, সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়, অদৃশ্য হিসাব লিখিত হয়। বহু মুফাসসিরের দৃষ্টিতে এই রাত এমন এক সময়, যখন মানুষের জীবনের গতি, রিজিকের পথ, সময়ের বাঁক আল্লাহর ইলমে নির্ধারিত হয়।
এই বিশ্বাস মানুষকে অহংকারহীন করে তোলে। কারণ তখন সে বুঝতে পারে—তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত, কিন্তু রবের ক্ষমা অসীম।
রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর বাণীতে এই রাতের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। আল্লাহ তাআলা এই রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন, ক্ষমার দরজা খুলে দেন। কিন্তু বিদ্বেষে পূর্ণ হৃদয়, অহংকারে আচ্ছন্ন অন্তর সেই করুণা থেকে নিজেই নিজেকে বঞ্চিত করে। এখানেই শবেবরাত কেবল ইবাদতের রাত নয়—এটি সম্পর্কের সংশোধনের রাত, অন্তরের পরিচ্ছন্নতার রাত।
ইমাম গাজ্জালীর দৃষ্টিতে এই রজনী আত্মসমালোচনার আয়না। মানুষ যতক্ষণ নিজের ভাঙন দেখতে না শেখে, ততক্ষণ সে নির্মাণের পথে হাঁটতে পারে না। আর ইমাম ইবনু তাইমিয়া শবেবরাতকে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের সময় হিসেবে দেখলেও স্পষ্ট করে দেন—এই অনুগ্রহ কেবল তাকেই ছুঁয়ে যায়, যে নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করে।
সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের জীবনে এই রাত কোনো উৎসব ছিল না। ছিল না আলোকসজ্জা, ছিল না উচ্চস্বরে আয়োজন। ছিল নিঃশব্দতা, ছিল দীর্ঘ সিজদা, ছিল নিজের সঙ্গে নিজের হিসাব। তাঁদের কাছে এই রাত মানে ছিল—আমি কে ছিলাম, আমি কী হয়ে গেছি, আর আমি কী হতে চাই।
এই রাত মানুষকে শেখায়—আমল কেবল সংখ্যার বিষয় নয়, বরং গভীরতার বিষয়। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, ইস্তিগফার, দোয়া—সবই তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা অন্তরের অনুশোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়। ক্ষমা চাওয়ার আগে ক্ষমা করার মানসিকতা তৈরি না হলে এই রাত অপূর্ণ থেকে যায়।
একই সঙ্গে এই রাত মানুষকে সংযম শেখায়। অপচয়, বাহুল্য, লোকদেখানো ধর্মীয় আচরণ—এসব এই রাতের নীরব ভাষার সঙ্গে যায় না। আলেমদের অভিমত এক জায়গায় এসে মিলেছে—যে আমল আত্মাকে ভারী করে, আলো নয়, সে আমল এই রাতের প্রকৃত শিক্ষা বহন করে না।
শবেবরাত আসলে মানুষের জন্য এক বিরল সুযোগ—দাঁড়িয়ে যাওয়ার, থেমে ভাবার। ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে, সম্পর্কের ক্লান্তিতে, আত্মিক শূন্যতার ভেতর এই রাত মানুষকে প্রশ্ন করে—
তুমি কি এখনো ফিরে আসতে চাও?
তোমার ভেতরের মানুষটি কি এখনো বেঁচে আছে?
এই রাত মানুষকে সাহস দেয়—ভুল স্বীকার করার সাহস, ক্ষমা চাওয়ার সাহস, আবার শুরু করার সাহস। কারণ আল্লাহর দরবারে সবচেয়ে মূল্যবান কোনো নিখুঁত আমল নয়—বরং ভাঙা অন্তর, নত মাথা, আর সত্যিকারের প্রত্যাবর্তন।
শবেবরাত তাই একটি রাতের নাম নয়।
এটি আত্মার নীরব ডাক, বিবেকের পুনর্জাগরণ, আর মানুষের ভেতরের মানুষটিকে আবার খুঁজে পাওয়ার এক অনাবিল মুহূর্ত।