একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনৈতিক দৃশ্যপট এক অভাবনীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। গত কয়েক দশকে ভূ-রাজনীতির যে ছক তৈরি হয়েছিল, তা আজ নতুন রূপ নিচ্ছে। অশুভ শক্তির দাপট, ভৌগোলিক সাম্রাজ্যবাদ এবং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিনের নিপীড়ন যেখানে একটি জাতিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে ঘটছে বিপরীত ঘটনা। পশ্চিমের প্রভাবশালী ভূখণ্ড—বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের মূলধারার রাজনীতি ও জনমতে—মুসলিম নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও উপস্থিতি দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যাকে বৈশ্বিক রাজনীতির ‘নতুন মেরুকরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন, তার নেপথ্যে রয়েছে এক ঐতিহাসিক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : নিপীড়ন ও প্রতিরোধের বৈশ্বিক সমীকরণ
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ইসলাম ও মুসলিমদের ওপর চেপে বসা যেকোনো সংকটকালই পরবর্তীতে নতুন কোনো সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ইসলামভীতি সৃষ্টি করে মুসলিম সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক ও মানসিকভাবে কোণঠাসা করার বৈশ্বিক অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু নিপীড়নের স্টিম রোলার যতই তীব্র হয়েছে, বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের সত্য জানার উৎসুক্য ও কৌতূহল ততটাই বেড়েছে।
বিশেষ করে ফিলিস্তিনের গাজা ও ভূখণ্ডে বছরের পর বছর ধরে চলা নৃশংস হত্যাযজ্ঞ, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর দ্বিচারিতা বিশ্ববিবেককে এক বড় ধাক্কা দিয়েছে। যখন সব রাষ্ট্রযন্ত্র ও গণমাধ্যম কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অন্যায়কে ঢাকতে সচেষ্ট থেকেছে, তখন মুসলিমদের ধৈর্য, অবিচল ঈমানি দৃঢ়তা এবং সহনশীলতার দৃষ্টান্ত বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। অবরুদ্ধ গাজার চরম দুর্যোগেও সেখানে মানুষের মুখে আত্মবিশ্বাস ও পরম করুণাময়ের ওপর বিশ্বাসের যে অনুপম নজির দেখা গেছে, তা পশ্চিমা বিশ্বকেও গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
আমেরিকা ও পশ্চিমে মুসলিম নেতৃত্বের বিকাশ
আমেরিকার মতো রাজনৈতিকভাবে জটিল এবং ইসরায়েলঘেঁষা নীতিতে পরিচালিত রাষ্ট্রে আজ পরিবর্তন দৃশ্যমান। একসময় মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিমদের অবস্থান ছিল কেবলই ভোটব্যাংক বা প্রান্তিক গোষ্ঠী হিসেবে। কিন্তু আজ চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
জনপ্রতিনিধিত্ব ও নীতি-নির্ধারণে উপস্থিতি : মার্কিন কংগ্রেসের ইলহান ওমর, রাশিদা তলাইবের মতো মুসলিম নারী নেত্রীরা আজ কেবল মুসলিমদের প্রতিনিধি নন, বরং তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল মানবতাবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। পররাষ্ট্রনীতি, ফিলিস্তিন ইস্যু এবং সার্বজনীন মানবাধিকার প্রশ্নে তাদের স্পষ্ট অবস্থান মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয় সরকার ও মূলধারার রাজনীতি : ডারবর্ন বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে মুসলিম মেয়রের জয় কিংবা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের প্রশাসনিক পদে মুসলিম নেতৃত্বের অবস্থান প্রমাণ করে যে, সাধারণ জনগণের কাছে তাদের যোগ্যতা ও আদর্শিক দৃঢ়তা সমাদৃত হচ্ছে।
পশ্চিমা জনমতের পরিবর্তন: শুধু রাজনীতিতেই নয়, মার্কিন ও ইউরোপীয় সিভিল সোসাইটি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মানবাধিকারের বার্তা নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন মুসলিম আন্দোলনকারীরা।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ও বৈশ্বিক জনমতে নৈতিক প্রভাব
ইসরায়েলের আগ্রাসী ও উগ্রবাদী নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে তার নৈতিক বৈধতা আজ চরম সংকটে। ইউরোপ ও আমেরিকার রাজপথে লাখ লাখ অমুসলিম তরুণের ফিলিস্তিনপন্থী মিছিলে শরিক হওয়া এবং ‘ফ্রি ফিলিস্তিন’ স্লোগান তোলা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি হচ্ছে মুসলিম আদর্শের সহজাত ন্যায়বিচার ও মানবতার জয়। ইসরায়েল ও তার মিত্রদের অশুভ চক্রান্ত সত্ত্বেও তাদের বিশ্বজুড়ে গণবিচ্ছিন্নতা এবং বিপরীতে মুসলিম নেতৃত্বের আদর্শিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
ইসলামের আদর্শিক সৌন্দর্য ও রাজনৈতিক শক্তির রসায়ন
মুসলিম নেতৃত্বের এই উত্থানের মূল ভিত্তি কিন্তু সামরিক বা অর্থনৈতিক বলপ্রয়োগ নয়; এর পেছনে রয়েছে ইসলামের চিরায়ত সৌন্দর্য—ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা, মানবিক সহানুভূতি এবং অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার নৈতিক সাহস। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরাশক্তিগুলো যখন কেবল নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত, তখন মুসলিম নেতারা ও তরুণ সমাজ সার্বজনীন মানবাধিকারের কথা বলছেন।
নৃশংসতা ও চক্রান্তের বিপরীতে আত্মত্যাগ ও সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার এই নীতিই আজ নিরপেক্ষ বৈশ্বিক সমাজকে আকর্ষণ করছে। অত্যাচার যত বেড়েছে, সত্যের আলো তত তীব্র হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, সাময়িক অন্ধকার কখনোই সত্যকে চিরতরে ঢেকে রাখতে পারে না। ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের যেখানেই অন্যায় ও জুলুম চালানো হয়েছে, সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে নতুন প্রতিরোধের ইতিহাস এবং আত্মমর্যাদাবোধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম নেতৃত্বের এই সুসংহত উত্থান কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি মানবজাতির ন্যায়বিচারের পক্ষে এক ঐতিহাসিক যাত্রা। অত্যাচার ও চক্রান্তের পর্বত ভেদ করে সত্য ও ন্যায়বিচারের যে নতুন উদয় ঘটছে, অদূর ভবিষ্যতে তা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাজনীতির দৃশ্যপটকে সম্পূর্ণ ইতিবাচকভাবে বদলে দেবে—এমন ইঙ্গিতই আজ স্পষ্ট।
লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
