• শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:০০ অপরাহ্ন

মোঃ ইমরান হোসাইন, কাশিমপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি / ১৪০ পাঠক
আপডেট শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৪

পুষ্প

মোঃ ইমরান হোসাইন

বিকালে আব্বুকে গিয়ে বললাম ” আমি এবার ঈদের দুই দিন পর বন্ধুদের সাথে নেপাল ট্যুরে যাব তো এখন হোটেল বুকিংয়ের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগবে! এখন টাকা দাও।”কিন্তু আব্বু সরাসরি না করে দিয়েছে। বরং উল্টো আরও কত গুলো কথা শুনিয়ে দিয়েছে। তাই মন খারাপ করে বাসা থেকে বেরিয়ে এসে ফার্মে একটা গাছের নিচে বসে ফোন টা হাতে নিয়ে গল্প পড়তেছি। এমন সময় দেখি এলোমেলো চুল আর ময়লা কাপড় গায়ে একটা মেয়ে সাথে আরেকটা ছোট ছেলে কিছু ফুলের তৈরি মালা নিয়ে একটু দূরেই দাড়িয়ে আছে। মেয়েটার বয়স ১০ থেকে ১২ আর ছেলেটার ৫ থেকে ৬ বছর হবে।

মেয়েটা : ভাইয়া একটা মালা নিবেন?

আমি : না, লাগবে না।

মেয়েটা : নেন না ভাইয়া, মাত্র ৫০ টাকা।

আমি : বলছি না লাগবে না যাও তো।

[একটু ধমক দিয়ে জোরে বললাম। অমনি মেয়েটার চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে গেল!]

মেয়েটা : ভাইয়া, সকাল থেকে একটা মালাও বেচতে পারিনি। তাই কিছু খেতেও পারি নাই।

[কথাটা শুনে মেয়েটার প্রতি একটু মায়া হলো তাই ফোনটা রেখে মেয়েটাকে ডাক দিয়ে বললাম “এদিকে আসো।” কথার সাথে সাথেই মেয়েটা আমার পাশে এসে দাঁড়াল পিছনে ছোট্ট ছেলেটাও আসলো।] তারপর,..

আমি : এই ছেলে টা তোমার কি হয়?

মেয়েটা : ও আমার ছোট ভাই, ওর নাম অন্তর।

আমি : এগুলো কী তুমি নিজের হাতে বানিয়েছো?

মেয়েটা : হ্যা, আমি নিজে বানিয়েছি।

আমি : বেশ সুন্দর হয়েছে! এটা তোমাকে কে শিখিয়েছেন?

মেয়েটা : কেউ না! আমি ছোট থেকেই ফুল অনেক পছন্দ করতাম। তাই বাবা আমার জন্য প্রতিদিন বাড়ি ফেরার সময় ফুল নিয়ে আসতো। আর সেগুলো দিয়ে আমি মালা বানাতাম। সেখান থেকে আস্তে আস্তে শিখেছি।

আমি : আচ্ছা, বাড়ি কোথায় তোমার?

মেয়েটা : ওই যে স্টেশনের পাশের বস্তিতে ঢুকেই প্রথম ঘরটাই আমাদের ।

আমি : তাহলে তোমার বাবা-মা কি করেন?

[কথাটা শেষ করেই তাকিয়ে দেখি তার মুখটা পুরো মলিন হয়ে গেছে। আর চোখ দুটো দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটার মত পানি গড়িয়ে পরছে।]

মেয়েটা : বাবা রিক্সা চালাতো। তয় গত রোজার ঈদে একটা বড় গাড়ির সাথে এক্সিডেন্টে করে মারা গেছে। পরে মা’ই মাইনসের বাসায় কাজ করে আমাদের খাওয়া তো। কিন্তু গত কয়েক মাস আগে মায়ের কি জানি হইছে বিছানা থেকে উঠতে পারে না। ডাক্তার কাছে গেছিলো ডাক্তার কইছে মায়ের ভালা হইতে নাকি মেলা টাকা লাগবো। তাই মা অসুস্থ হওয়ার পর থাইকা আমি এমনে ফুল বেচি। বাবার কাছে আগে ঈদের সময় অনেক আব্দার করতাম। বাবা সব সময় আমার সব আব্দার পূরণ করতো। তারপর বাবা মরণের পর থাইকা মা সে আব্দার গুলো পূরণ করার চেষ্টা করতো। কিন্তু এখন আমার সেই আব্দার পূরণ করার শক্তি মা-র নাই। দুই দিন পর ঈদ। তাই আমি এই কয়দিন একটু বেশি মালা বিক্রি করার চেস্টা করি। মাংস কিনতে না পারলেও মা’র জন্য একটা বড় দেখে মুরগি কিনে নিয়ে যাবো।আর প্রতিদিন কিছু টাকা জমায় মা’র চিকিৎসার জন্য।

[মেয়েটার কথা শুনে নিজের অজান্তেই চোখ দিয়েপানি বেড়িয়ে গেল একটুও টের পেলাম না। জীবনে কি করলাম আব্বু-আস্মুর জন্য, এই বাইশ বছর ধরে শুধু আব্বুর কাঁধের উপর বসে আছি। আজ সকালেও টাকার জন্য রাগ দেখিয়ে আসছি। সরি আব্বু-আম্মু আজও তোমার গর্বের কোনো কারণ হতে পারলাম না।] তারপর..

আমি : তোমার এখানে কয়টা মালা আছে?

মেয়েটা : ভাইয়া দশটা আছে।

[বেশ হাস্যোজ্বল মুখ নিয়ে বললো ]

আমি : সবগুলো আমাকে দাও।

মেয়েটা : এতো মালা দিয়ে কি করবেন?

আমি : আমার এক বন্ধুকে দিবো।

মেয়েটা : নিন ভাইয়া। [হাসি মুখে বললো]

[আমি পকেট থেকে বের করে এক হাজার টাকার একটা নোট দিলাম। ]

আমি : এই নাও!

মেয়েটা : ভাইয়া আমার কাছে ভাংতি নেই।

আমি : ভাংতি লাগবেনা সবটাই তুমি রেখে দাও।

মেয়েটা : না ভাইয়া আমি কারো কাছ থেকে কিছু নিই না। যেটা পাওনা সেটা দিলেই হবে।

আমি : ৫০০ টাকা দিয়ে বললাম, আচ্ছা এই নাও।

মেয়েটা : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।

আমি : এই নাও এগুলো তোমাকে আমার ছোট্ট বন্ধু হিসেবে উপহার দিলাম।

[মেয়েটাও কথা কথা না বাড়িয়ে মালা গুলো নিয়ে হাসি মুখে চলে যাচ্ছে.. ]

আমি : আচ্ছা তোমার নামটাই তো জানা হলো না?

মেয়েটা ‘ পুষ্প!

[নামটা বলেই পুষ্প তার ভাই কে সাথে নিয়ে চলে গেল। আর আমি সেখানেই বসে আছি, আর ভাবতেছি এই ফুল গুলো বিক্রি করে আরো কিছু টাকা পাবে হয়তো সে তার মনে আসা পূরণ করার চেষ্টা করবে। এভাবে কিছুক্ষণ বসে পর বাসায় ফিরলাম। বাসায় ডুকেই দেখি আব্বু ড্রয়িং রুমে বসে আছে। আমি চুপচাপ আমার রুমের এদিকে চলে যাচ্ছি।তখনই আব্বু ডাক দিলেন!]

আব্বু : সারাদিন কোথায়, আব্বুর উপর রাগ করছো?

আমি : না আব্বু!

আব্বু : ঠিক আছে, ফ্রেশ হয়ে আসো, তোমার জন্য টাকা ব্যবস্থা করে রেখেছি।কিছুক্ষণ পরে তোমার আম্মুর কাছ থেকে এসে নিয়ে যেয়ো।

আমি : লাগবে না। [বলেই সরাসরি নিজের রুমে চলে গেলাম। এর পরের দিন ঈদের নামাজ আদায় করে সবাই এক সাথে খেতে বসছি। হঠাৎ পুষ্পের কথা মনে পড়লো। তারপর আম্মু কে বললাম “একটা টিপিন বক্সে কয়েকটা রুটি আর রুটি মাংসের তরকারি দাও। আমার এক ছোট বন্ধুর জন্য নিয়ে যাব “আর আব্বু কে বললাম “কিছুদিন পর আমার এই টাকা গুলো লাগবে বন্ধুর মায়ের চিকিৎসা করাতে হবে।” বলেই উঠে পরলাম। রওনা হলাম পুষ্পদের বাড়ির উদ্দেশ্য গিয়ে দেখি একটা ছোট ঘর, পুষ্প ভিতরে তার মাকে খাইয়ে দিচ্ছে।আর ভাইটা পাশেই বসে আছে। সে আমাকে দেখেই একটা হাসি দিলো।

পুষ্প : আরে ভাইয়া, আপনি এখানে?

আমি : এগুলো তোমার জন্য নিয়ে আসছি ।

পুষ্প : আসো ভাইয়া ভিতরে আসো।

[ভিতর গিয়ে একটু বসে তার মায়ের সঙ্গে কিছু কথা বললাম ওনার চিকিৎসার বিষয়ে। যখন তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হবো ঠিক তখনই সাদা পলিথিনে মোড়ানো কিছু শুকনো মালার দিকে চোখ পরলো।]

আমি : এই মালা গুলো তো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে !

পুষ্প : এগুলো তোমার দেওয়া কালকের উপহার গুলো।

আমি : তুমি এগুলো বিক্রি করনি?

পুষ্প : তুমি আমাকে বন্ধু বলে এগুলো উপহার দিলে। আমি কি সেই বন্ধুর দেওয়া উপহার বিক্রি করে দিতে পারি? তাই যত্ন করে রেখে দিলাম।

বার্তা বিভাগ


আপনার মতামত লিখুন :
এই বিভাগের আরোও