Busimess

 

আসাদুল ইসলাম জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা এল নিনোর হিসাব জানেন না। কিন্তু ৫৬ বছর বয়সী এই রিকশাচালক ভালোভাবেই টের পান, গরম আগের চেয়ে বেড়েছে। রাজধানীর মণিপুরিপাড়ায় রিকশা চালাতে গিয়ে গত জুনে একদিন মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। আসাদুল বলেন, ‘এমন এহন অনেকের হয়। গরম বাড়ছে বহুত।’

কাজ শেষে ঘরেও স্বস্তি নেই। একটি ছোট ঘরে কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে ঠ্যাসাঠেসি করে থাকেন তিনি। দিনে গরম হয়ে ওঠা ঘরটি রাতেও সহজে ঠান্ডা হয় না।

আসাদুলের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন নয়। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচণ্ড গরমে ঘরের বাইরে কাজ করা একজন শ্রমিক বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭ এবং ঘরের ভেতরে কাজ করা শ্রমিক ১৩ দশমিক ৫ কর্মদিবস হারাচ্ছেন। এভাবে কর্মদিবসের ক্ষতি এবং চিকিৎসাজনিত সমস্যায় বছরে ৭৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইইডি) ও অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) যৌথভাবে গবেষণাটি করেছে। এর শিরোনাম ‘টু হট টু ওয়ার্ক, টু পুওর টু রেস্ট’। আগামীকাল বুধবার এ গবেষণা প্রকাশিত হবে।

নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচণ্ড গরমে ঘরের বাইরে কাজ করা একজন শ্রমিক বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭ এবং ঘরের ভেতরে কাজ করা শ্রমিক ১৩ দশমিক ৫ কর্মদিবস হারাচ্ছেন। এভাবে কর্মদিবসের ক্ষতি এবং চিকিৎসাজনিত সমস্যায় বছরে ৭৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
গবেষণার জন্য ঢাকার ১৭৫টি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে ১২২টি পরিবার নির্মাণ, সড়কের কাজ ও রিকশা চালানোর মতো বাইরের এবং ৫৩টি পোশাকশিল্পের মতো ভেতরের কর্মক্ষেত্রে যুক্ত। জরিপের পাশাপাশি শ্রমিকদের কাজ ও বিশ্রামের সময় পর্যবেক্ষণ, দলীয় আলোচনা, সাক্ষাৎকার ও পারিবারিক কেস স্টাডি করা হয়েছে। তিন চিকিৎসকের একটি প্যানেল স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ফল পর্যালোচনা করেছে।

গবেষণার ফল জাতীয় শ্রমশক্তি জরিপ ও অঞ্চলভিত্তিক তাপমাত্রার তীব্রতার সঙ্গে সমন্বয় করে জাতীয় ক্ষতি প্রাক্কলন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে। এসব শ্রমিকের আয় কাজের উপস্থিতি ও উৎপাদনক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। গরমে কাজ বন্ধ রাখা বা কাজের গতি কমে যাওয়ার অর্থ তাই আয় হারানো।

গবেষণায় দীপক নামের একজন নির্মাণশ্রমিক বলেন, ‘কখনো কখনো ঠিকমতো শ্বাসও নিতে পারি না। কংক্রিট থেকে ওঠা তাপে মনে হয়, চামড়া পুড়ে যাচ্ছে।’

ঘরের বাইরে কাজ করা একজন শ্রমিক বছরে গড়ে ১৪৮ দশমিক ৯ এবং ভেতরে কাজ করা শ্রমিক ৮৯ দশমিক ১ ডলার মজুরি হারান। ঢাকায় জীবনধারণযোগ্য মজুরি মাসে ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা। অথচ বাইরের কাজ করা শ্রমিক পরিবার ওই আয়ের চেয়ে ৪১ দশমিক ৪ এবং ভেতরে কাজ করা শ্রমিক পরিবার ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ পিছিয়ে থাকে। তাপজনিত আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি যুক্ত হলে ঘাটতি বেড়ে যথাক্রমে ৪৬ দশমিক ৪ ও ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ হয়।

আইআইইডির জলবায়ু সহনশীলতা, অর্থায়ন ও ক্ষয়ক্ষতি বিভাগের পরিচালক ঋতু ভরদ্বাজ ই–মেইলে প্রথম আলোকে বলেন, গরমে শ্রমিকের কাজের গতি কমলে ক্ষতিটি তাঁকেই নীরবে বহন করতে হয়। তাঁরা আয় হারান, সঞ্চয় ভাঙেন কিংবা ঋণ নেন। এর কোনো হিসাব রাখা হয় না, ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয় না।

সমস্যা শুধু কর্মস্থলে সীমাবদ্ধ নয়। ঘরের ভেতরে কাজ করা শ্রমিক পরিবারের ৬৬ শতাংশ এবং বাইরের শ্রমিক পরিবারের ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ টিন বা অ্যাসবেস্টসের ছাদের নিচে বাস করে। গাদাগাদি ঘর, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে কাজ শেষে শরীরের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও ঘুম ব্যাহত হয়।

জরিপে ২৩ দশমিক ১ শতাংশ শ্রমিক কিডনির সমস্যার কথা বলেন। গবেষকদের অনুমান, দীর্ঘদিন তাপে থাকলে মোট শ্রমিকের প্রায় ৬ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। হিটস্ট্রোকের অভিজ্ঞতা থাকা প্রতি ২০ শ্রমিকের প্রায় ১৯ জন চিকিৎসাও নেননি।

সমস্যা শুধু কর্মস্থলে সীমাবদ্ধ নয়। ঘরের ভেতরে কাজ করা শ্রমিক পরিবারের ৬৬ শতাংশ এবং বাইরের শ্রমিক পরিবারের ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ টিন বা অ্যাসবেস্টসের ছাদের নিচে বাস করে। গাদাগাদি ঘর, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে কাজ শেষে শরীরের প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও ঘুম ব্যাহত হয়।

আশুলিয়ার কেইপিজেড বিশেষায়িত হাসপাতালের রোগীদের একটি বড় অংশ শ্রমিক। এর পরিচালক রাজীব হাসান প্রথম আলোকে বলেন, গরমের সময় ডায়রিয়াজনিত রোগী বাড়ে। ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে শুধু এ সমস্যা নিয়ে প্রায় ১০ জন রোগী আসেন। স্বাস্থ্যবিধি না মানা ও দূষিত খাবার-পানি এর কারণ হলেও অতিরিক্ত তাপের সঙ্গেও নিঃসন্দেহে সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে ক্ষতির যে পরিমাণ দেখলাম, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমাজের একটি নির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ শ্রমজীবীগোষ্ঠীর মানুষেরা যে বড় সমস্যায় পড়েছে, তা নিয়ে দ্বিমত করার কিছু নেই। তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি বিশেষ করে একটি বহুমাত্রিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। গবেষণায় সেটি যথার্থ এবং প্রয়োজনীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষকদের হিসাবে, তাপপ্রবাহে অসুস্থতা ও উৎপাদনক্ষমতা কমায় দেশে বছরে প্রায় ১১৮ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়। এতে শ্রমিকদের হারানো মজুরি প্রায় ৪১০ কোটি ডলার, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশের সমান।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগে কর্মক্ষমতা কমার প্রাক্কলিত ক্ষতি যোগ করলে হারানো মজুরি দাঁড়ায় ৬২২ কোটি ডলার, যা জিডিপির ১ দশমিক ৩৮ শতাংশের সমান। বর্তমান বিনিময় হারে তা প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘গবেষণা প্রতিবেদনে ক্ষতির যে পরিমাণ দেখলাম, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমাজের একটি নির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ শ্রমজীবীগোষ্ঠীর মানুষেরা যে বড় সমস্যায় পড়েছে, তা নিয়ে দ্বিমত করার কিছু নেই। তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি বিশেষ করে একটি বহুমাত্রিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। গবেষণায় সেটি যথার্থ এবং প্রয়োজনীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।’

২০২৫ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। রাজধানী ঢাকার তাপসূচক জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি বেড়েছে।

২০২৪ সালে তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যার কারণে দেশে ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে।

শ্রম আইন ও বিধিমালায় কর্মক্ষেত্রে বায়ু চলাচলের পাশাপাশি পানীয় জল ও বিশ্রাম নেওয়ার সাধারণ বিধান থাকলেও কাজের জন্য তাপমাত্রার নিরাপদ সীমা নেই। তাপমাত্রাভিত্তিক বাধ্যতামূলক বিরতির বিধানও নেই; তাপজনিত অসুস্থতা পেশাগত রোগ হিসেবে স্বীকৃত নয়।

শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতানউদ্দিন আহম্মদ বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির এ অবস্থায় অবশ্যই শ্রম আইন সংশোধন দরকার। কীভাবে এই তাপ মাপা হবে, তার প্রযুক্তিগত দিকটিও তুলে ধরতে হবে। আর একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর বিরতি দেওয়ার বিধান আইনে সংযোজন করতে হবে। গবেষণায় এ দিকটি তুলে ধরে একটি মৌলিক দিকে নজর দেওয়া হয়েছে।

গবেষকেরা তাপমাত্রাভিত্তিক নগদ সহায়তা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যসহায়তা, কর্মস্থলে পানি, ইলেকট্রোলাইট, ছায়া ও বাধ্যতামূলক বিরতির সুপারিশ করেছেন। প্রস্তাবিত সহায়তা প্যাকেজে বছরে প্রায় ৮৭৩ কোটি থেকে ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা লাগতে পারে, বর্তমান ক্ষতির তুলনায় যা অনেক কম।