নিজস্ব প্রতিবেদক :
ডা. জাফরুল্লাহ চেয়েছিলেন এখানে (গণ বিশ্ববিদ্যালয়) মেয়েদের নেতৃত্ব তৈরি হোক, এখানকার মেয়েরা জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেবে এটা ছিল উনার স্বপ্ন। কিন্তু সেভাবে তাদের (নারী) নেতৃত্বে বা রাজনীতিতে কোনো আগ্রহ দেখলাম না। এটা আমার কাছে হতাশাজনক লাগছে, গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (গকসু) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারী নেতৃত্বের সঙ্কট নিয়ে এভাবেই নিজের হতাশা প্রকাশ করেন গকসুর সবশেষ নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) জুয়েল রানা। তবে শুধু জুয়েলই নন, এমন হতাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক থেকে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যেই।
২০১৩ সালে প্রথমবার গকসুর নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) হন এমবিবিএস ১৪ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মিশু এবং কোষাধ্যক্ষ হন ফার্মেসি বিভাগের মৌসুমি। দ্বিতীয় সংসদে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন আইন বিভাগের কণিকা। সবশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন ফার্মেসি বিভাগের খাদিজাতুত তাহিয়া সেতু। কিন্তু এর বাইরে গকসুর শীর্ষ পদে নারী নেতৃত্ব তেমন দেখা যায়নি।
গত ৯ আগস্ট গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের চতুর্থ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। তবে এবারও সেই নারী নেতৃত্বের সঙ্কট। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান অনেকেই।
গত ১২ আগস্ট নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে গকসুর সবশেষ নির্বাচিত ভিপি জুয়েল রানা আরও লিখেন, উনার (ডা. জাফরুল্লাহ) স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে, নারী নেতৃত্ব তৈরিতে প্রশাসনের ও আগামী সংসদের কাজ করা আবশ্যক মনে করি। এ বিষয় নিয়ে আমি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি, সবার সাহায্য দরকার।
জুয়েল রানার সুরেই নারী নেতৃত্ব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরাও।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সুলতানা আক্তার মিতু বলেন, নারী শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক বাধার ব্যাপারটা প্রকাশ্য, তারা মনে করে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের ফলে ট্রলিং এর শিকার বা কটাক্ষ বা নিরাপত্তা জনিত উদ্বেগের মুখে পড়তে পারে, যার ফলে তারা নির্বাচন থেকে দূরে থাকে। সামাজিক স্বীকৃত ও পারিবারিক সমর্থন না থাকার ফলে অনেক নারী শিক্ষার্থী রয়েছে যারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না।
ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী আল-আরাফাত বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে মেয়েদের অংশগ্রহণ কমার অন্যতম কারণ নিরাপত্তাহীনতা ও উৎসাহের অভাব। বিগ নির্বাচনে দেখা গেছে, একই বিভাগ থেকে দুইজন ছেলে প্রার্থী দাঁড়ালে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত, যা মেয়েদের মধ্যে ভীতি তৈরি করেছে। এমনকি একজন মেয়ে প্রার্থী দাঁড়ালেও তার নিরাপত্তার দায়িত্ব বিভাগ নেয় না। ফলে প্রশ্ন রয়ে যায়—নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে মেয়েরা কীভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে? এই অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেই মূলত মেয়েরা নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী হচ্ছে না।
রাজনীতি ও প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক হাবিবুল্লাহ্ বেলালী বলেন, গকসুতে নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে কম, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি সহিংস হওয়ার যে আভাস দিনকে দিন স্পষ্ট হচ্ছে তা নারীদের কে স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিক বা প্রতিনিধিত্বশীল কোনো জায়গাতে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত হতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে গবি নারী ক্ষমতায়ন ও নারী নেতৃত্ব তৈরিতে যে অসামান্য ভূমিকা রেখে চলেছিলো সেগুলো ধারাবাহিকতা রক্ষায় বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতা বিদ্যমান ফলে নিয়মিতভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় নির্বাচন সচেতনতা ও প্রস্তুতিতে নারীরা অপেক্ষাকৃতভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিলুফার সুলতানা বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মভীরুতার বিষয় বেশি পরিমাণে লক্ষণীয়। তবে সেদিক থেকে আবার তাদের রাজনৈতিক চিন্তা অনেক কম। আবার সামাজিক ভাবে নারীদের নিরাপত্তা একেবারেই কম। সমাজব্যবস্থায় যেখানে নারীকে বরাবর পিছিয়ে রাখা হচ্ছে। তবে আমরা আশাবাদী গকসু নির্বাচনের মধ্যদিয়ে দক্ষ নারী নেতৃত্ব বের হয়ে এসে সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, নারী নেতৃত্বের ব্যাপারে আমরা আগে থেকেই সচেতন। আমরা ফ্রি এন্ড ফেয়ার ইলেকশন আশাকরি। নারীদের ক্ষেত্রে আমরা বিশেষ অধিকার সংরক্ষণ করছি, অনুষদ প্রতিনিধির ক্ষেত্রে কোনো অনুষদে ২জন প্রতিনিধি হলে সেখানে অবশ্যই একজন নারী নেতৃত্ব আসতেই হবে। একইভাবে শিক্ষার্থীদের প্রতিও আহ্বান থাকবে যাতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে তাদের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব থাকে। সকল অংশীজনের সার্বিক অংশগ্রহণে নির্বাচন ফলপ্রসূ হবে।
রিতু আক্তার । বার্তা বিভাগ